আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শেখ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এখনো দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। কেউ ভারত, কেউ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা কিংবা সিঙ্গাপুরে রয়েছেন। দেশে থাকার সময় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ, সংসদ সদস্য, মেয়র কিংবা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ দায়িত্বে থাকা পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অনেকের বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ। তবে এখন পর্যন্ত তাদের অধিকাংশেরই দেশে ফিরে এসব মামলার মুখোমুখি হওয়ার কোনো আগ্রহ প্রকাশ্যে দেখা যায়নি বলে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সূত্র সুখবর ডটকমকে জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে করা একটি মামলায় মৃ’\ত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে। শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কোনো আগ্রহের কথা এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার এই ঘোষণা তার পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থানের সঙ্গে একটি স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় শেখ পরিবারের একাধিক সদস্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি ছিলেন। কেউ ছিলেন সংসদ সদস্য, কেউ মন্ত্রী পদমর্যাদার দায়িত্বে, কেউ মেয়র, আবার কেউ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা নেওয়া এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনা ও পরিবারের সদস্যদের অবস্থান
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন তার ছোট বোন শেখ রেহানা। এরপর শেখ রেহানা ভারত ও যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বলে আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন। তিনি যুক্তরাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা এবং ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। দেশে ফেরার বিষয়ে তার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রকাশ্যে সক্রিয় ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই ছিলেন। সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছেন। তবে দেশে ফেরার কোনো ঘোষণা দেননি।
শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংস্থাটির আঞ্চলিক কার্যালয় নয়াদিল্লিতে হওয়ায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানো হলেও বেতন-ভাতা চালু রয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, তিনি ভারত ও দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। দেশে ফেরার বিষয়ে তারও কোনো আগ্রহের কথা জানা যায়নি।
শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সময় তিনি থাইল্যান্ডে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য। তার স্ত্রী ফিনল্যান্ডের নাগরিক। সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশে ফেরার কোনো উদ্যোগ তার পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে আসেনি।
শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ নাগরিক এবং যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের সদস্য। তার আরেক মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীও যুক্তরাজ্যের নাগরিক। শেখ পরিবারের এই সদস্যদের কারও দেশে ফেরার কোনো ঘোষণা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অবস্থাও একই
শেখ পরিবারের বাইরে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত আত্মীয়দের অবস্থাও অনেকটা একই। শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সংসদ সদস্য ছিলেন। তার ছেলে শেখ ফজলে ফাহিম ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি। আরেক ছেলে শেখ ফজলে নাঈম যুবলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ সেলিমের পরিবারের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে যান। ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকেও কোনো ঘোষণা আসেনি।
শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। সরকার পতনের আগে তিনি কানাডা থেকে দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। ৫ আগস্টের পর ভারত হয়ে কানাডায় চলে যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য। পরে তিনি আবার ভারতেও গেছেন বলে জানা গেছে।
তার ছোট ভাই শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট সকালে তিনি সিঙ্গাপুর যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তাপসের বিদেশ যাওয়ার সেই চেষ্টার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ ছড়িয়ে পড়ার পর। ফোনালাপে তাপস শেখ হাসিনার কাছে সিঙ্গাপুর যাওয়ার অনুমতি চান। কথোপকথন অনুযায়ী, তিনি তখন বিমানবন্দরে ছিলেন এবং ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে আটকে দিয়েছিল। পরে তিনি বিদেশ যেতে সক্ষম হন। সেই সময় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল। ৫ আগস্টের মাত্র দুই দিন আগে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরিস্থিতিও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
শেখ হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ দীর্ঘদিন বরিশাল অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ছিলেন। তার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য ভারতে চলে যান বলে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য। সাদিক আবদুল্লাহ পরে ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন বলে ধারণা করা হয়। তাদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ ও মামলা রয়েছে। কিন্তু দেশে ফিরে সেগুলোর মোকাবিলা করার বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
খুলনা অঞ্চলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রভাবশালী ছিলেন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দীন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল। দুজনই সংসদ সদস্য ছিলেন। শেখ হেলালের ছেলে শেখ তন্ময়ও সংসদ সদস্য ছিলেন। সরকার পতনের পর তারা ভারতে চলে গেছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। কলকাতার নিউ টাউন এলাকায় তাদের অবস্থানের কথাও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের অবস্থান নিয়েও নানা তথ্য রয়েছে। তবে তাদের কেউ দেশে ফেরার ঘোষণা দেননি।
শেখ হাসিনার ফুফাতো বোনের দুই ছেলে নূর-ই আলম চৌধুরী ও মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। নূর-ই আলম চৌধুরী সংসদের চিফ হুইপ ছিলেন। মুজিবুর রহমান চৌধুরী ছিলেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও যুবলীগের সাবেক নেতা। সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তারা আত্মগোপনে চলে যান এবং পরে ভারতে অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য।
বিদেশে থাকা সদস্যদের তালিকা আরও দীর্ঘ
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, শেখ পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। কেউ ভারত, কেউ সিঙ্গাপুর, আবার কেউ যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, যিনি শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের সাবেক শ্বশুর, বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে আছেন বলে জানা গেছে। সাবেক সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তার বিরুদ্ধেও নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ও পরে শেখ পরিবারের অনেক সদস্য সীমান্তপথে দেশ ছাড়তে সক্ষম হন। সাতক্ষীরা, সিলেট ও ময়মনসিংহ সীমান্ত ব্যবহার করে কেউ কেউ ভারতে গেছেন বলেও দলের নেতারা জানিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থের বিনিময়ে তাদের দেশত্যাগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
এই নিরাপদে দেশ ছাড়ার বিষয়টি আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যেও ক্ষোভের কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দলের বহু নেতা-কর্মী গ্রে’\প্তার হয়েছেন, অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন, আবার অনেকে মামলা মোকাবিলা করছেন। সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি বড় অংশ কারাগারে রয়েছেন।
কাজী জাফর উল্যাহ, আব্দুর রাজ্জাক, ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, আহমদ হোসেন ও আবদুস সোবহান গোলাপসহ আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা কারাগারে আছেন। শেখ হাসিনার সরকারের উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ পলকও কারাগারে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা বিচারাধীন।
অন্যদিকে, গত দেড় দশকে ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা শেখ পরিবারের যেসব সদস্যের প্রভাব ছিল, তাদের অধিকাংশই এখন দেশের বাইরে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—ক্ষমতার সময়ে সুবিধা নেওয়া এবং দল ও সরকারের প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ব্যক্তিরা সংকটের সময় সাধারণ নেতা-কর্মীদের পাশে থাকছেন না কেন?
রাজনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, শেখ হাসিনার রাজনীতিতে ক্ষমতা ও জ্ঞাতিগোষ্ঠীর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তার মতে, ক্ষমতায় থাকার সময় শেখ পরিবারের সদস্যরা নানা সুবিধা পেয়েছেন এবং সরকার পতনের সময় তাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
এদিকে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা নতুন করে রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি করেছে। তিনি নিজেই বলেছেন, মামলা ও মৃ’\ত্যুদণ্ডের ঝুঁকি জেনেও দেশে ফিরতে চান এবং আদালতের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে এখন পর্যন্ত একই ধরনের প্রস্তুতির কথা প্রকাশ্যে আসেনি।
অর্থাৎ, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জানালেও শেখ পরিবারের অন্য সদস্যরা আপাতত বিদেশের নিরাপদ অবস্থানেই থাকতে চাইছেন। ক্ষমতায় থাকার সময়ে রাষ্ট্র ও আওয়ামী লীগের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এই পরিবারের সদস্যদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—তারা দেশে ফিরে অভিযোগ, মামলা ও রাজনৈতিক বিরোধের মুখোমুখি হবেন, নাকি বিদেশেই অবস্থান করবেন?
ডিসেম্বর ঘিরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা যতই আলোচনায় আসছে, পরিবারের অন্য সদস্যদের নীরবতাও তত বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
