ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় অনুযায়ী সাজা কার্যকর করতে চায় সরকার—এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা, আপনার আসতে হবে না, আপনাকে আমরা ধরে নিয়ে আসতে চাই। আপনি আসামি, আপনি পলাতক আসামি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। আপনার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে।’
মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা।
জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর দাবি ভারতের ওপর চাপ তৈরির কোনো কৌশল নয়। বিষয়টি ভারত সরকারের কাছে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। তাঁর অনুপস্থিতিতে গণঅভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে, আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার এখন আর আপিলের সুযোগ নেই। তাই তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় অনুযায়ী সাজা কার্যকর করাই সরকারের লক্ষ্য।
তথ্য উপদেষ্টার ভাষায়, ‘টেকনিক্যালি এখন ব্যাপারটা এ রকম, তিনি আসবেন এবং তাঁর জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে। আমরা তাঁকে ধরে আনতে চাই।’
ভারতের গণমাধ্যমে শেখ হাসিনাকে কথা বলতে দেওয়া অপ্রত্যাশিত
ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা সম্প্রতি দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার ও রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন জাহেদ উর রহমান। তাঁর ভাষায়, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া বাংলাদেশ সরকারের কাছে ‘অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত’ ও ‘ইরিটেটিং’।
জাহেদ উর রহমান বলেন, প্রত্যর্পণ না হওয়া পর্যন্ত শেখ হাসিনা যেন এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতে না পারেন, ভারত সরকারের কাছ থেকে বাংলাদেশ এমন পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উন্নয়নে ভারত চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. জাহেদ বলেন, ‘ভারত সরকার সম্পর্কটা উন্নতি করার জন্য অন্তত তাৎক্ষণিক একটা পদক্ষেপ নিতে পারত, সেটা হচ্ছে তাঁর (শেখ হাসিনার) মুখ বন্ধ রাখা। সেটা কেন নিচ্ছে না, সেই জবাব আমার মনে হয় আমি আপনাদের কাছে চাইব।’
শেখ হাসিনা ভারতে কী ধরনের মর্যাদা বা অধিকার ভোগ করছেন, সে বিষয়েও সরকারের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা।
বাঁধনকে হেনস্তার ঘটনায় নিন্দা, আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া গ্যাং’ বললেন জাহেদ
অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে ইতালিতে হেনস্তা করার ঘটনায়ও তীব্র নিন্দা জানান জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক দল নয়; এটি একটি মাফিয়া গ্যাং। তাঁর দাবি, দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ন্যূনতম অনুশোচনাও নেই।
চাকরি পরীক্ষায় মৌখিকের নম্বর বাড়ছে
সরকারি চাকরিতে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে কিংবা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য এই পরিবর্তন আনা হয়নি। দক্ষ ও যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এই পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেন তিনি।
বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে এককালীন অর্থ দিতে হবে না
মার্কিন নির্মাতা বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার প্রসঙ্গেও কথা বলেন জাহেদ উর রহমান। তিনি জানান, উড়োজাহাজ কেনার অর্থ সরকারকে এখনই এককালীন পরিশোধ করতে হবে না। দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে অর্থ পরিশোধ করা হবে।
ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাস থেকেও উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের দীর্ঘসূত্রতার সমালোচনা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতার সমালোচনাও করেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, প্রায় দেড় বছর সময় পাওয়া সত্ত্বেও ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) বা বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এর ফলে বর্তমান সরকারকে জনগণের সাময়িক সংকট কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন জাহেদ উর রহমান।
