তিন দশক ধরে ঝুলে থাকা চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃ’\ত্যুরহস্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডন। পাঁচ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বুধবার তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সিআইডির দাবি, সালমান শাহর হ’\ত্যাকাণ্ডে ডনের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। রিমান্ডে পাওয়া তথ্য ও অন্যান্য আলামত এখন যাচাই করে দেখছে তদন্ত সংস্থা। তদন্তের প্রয়োজনে যে কোনো সময় আবারও তাকে রিমান্ডে নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
সালমান শাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তার অনেক কিছু জানার কথা থাকলেও জিজ্ঞাসাবাদের সময় ডন গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য এড়িয়ে গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ঘটনার আগে, পরে এবং মৃ’\ত্যুর সময় তার আচরণ ও গতিবিধি বিশ্লেষণ করেও মামলার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে সিআইডি।
বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে ডনকে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। রিমান্ড শেষ হওয়ার পর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখার আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। প্রসিকিউশন সূত্র জানিয়েছে, এদিন ডনের পক্ষে কোনো আবেদন করা হয়নি।
এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে ছিলেন ডন। ৩০ বছর আগে একই দিনে, অর্থাৎ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মৃ’\ত্যু হয় তৎকালীন জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহর। একই দিনে ডনকে রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনাটি নিছক কাকতালীয়, নাকি তদন্ত সংস্থার কোনো সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ—এ প্রশ্নের উত্তর জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ‘আমার দেশ’কে জানিয়েছে।
রিমান্ডে কী ঘটেছে?
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, রিমান্ডে ডন অনেক সময় প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে নিজের জীবনযাপন নিয়ে কথা বলে মূল প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি খুব সাধারণভাবে চলেন, কখনো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হননি—এ ধরনের বিষয় জিজ্ঞাসাবাদের বাইরে তুলে ধরে বারবার প্রসঙ্গ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছেন বলে সূত্রের দাবি।
হ’\ত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করা হলে একাধিকবার উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন ডন। ফলে তার বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য তথ্য ও আলামতের মিল খুঁজে দেখার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার সম্ভাব্য দিকগুলোও বিশ্লেষণ করছে তদন্ত সংস্থা।
সূত্র জানায়, ডনের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তির যোগসূত্র পাওয়া গেলে প্রয়োজনে এজাহারে নাম থাকা আসামিদের বাইরেও যেকোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী ডনকে অন্যদের মুখোমুখি বসিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
দীর্ঘ বন্ধুত্ব, তবু বক্তব্যে অসংগতি
আদালতে দেওয়া সিআইডির আবেদনে বলা হয়েছে, সালমান শাহর সঙ্গে ডনের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তারা একাধিক চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করেছেন। সে কারণে সালমানের ব্যক্তিগত জীবন, চলাফেরা এবং তার ঘনিষ্ঠজনদের সম্পর্কে ডনের জানাশোনা থাকার কথা।
মামলার এজাহারে থাকা পলাতক আসামিদের সম্পর্কেও জিজ্ঞাসাবাদে ডন তাদের চেনেন বলে জানিয়েছেন। তবে মামলার মূল ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তার বক্তব্যে বেশ কিছু অসংগতি এবং এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে বলে আদালতে দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করেছে সিআইডি।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্যের ওপর নির্ভর করছে না তদন্ত। সালমান শাহর মৃ’\ত্যুর আগে, ঘটনার সময় এবং পরে ডনের আচরণ ও চলাফেরার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে মামলার ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কিছু সূত্র পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
তবে রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের কাজ এখনো চলছে। তদন্ত সংস্থা বলছে, প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে ডনকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
গ্রেপ্তার থেকে রিমান্ড
গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেন।
২৭ আগস্ট শুনানি শেষে আদালত ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেই রিমান্ড শেষে বুধবার তাকে আবার আদালতে হাজির করা হয়।
এর আগে সিআইডি সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে তিনটি কারণ দেখিয়েছিল। তদন্ত সংস্থার বক্তব্য ছিল, ডনকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মামলার প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে তার মাধ্যমে মামলার অন্য আসামিদের বিষয়ে তথ্য এবং বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা-সংক্রান্ত বিষয়ও জানার চেষ্টা করা হবে বলে আদালতকে জানিয়েছিল তদন্ত সংস্থা।
দীর্ঘদিনের রহস্য, এবার হ’\ত্যা মামলা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে মৃ’\ত্যু হয় সালমান শাহর। তার মৃ’\ত্যুকে ঘিরে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল—এটি আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হ’\ত্যাকাণ্ড। মৃ’\ত্যুর পর রমনা থানায় অপমৃ’\ত্যুর মামলা হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চললেও এ নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সালমান শাহর মৃ’\ত্যুর ঘটনায় করা অপমৃ’\ত্যুর মামলা বাতিল করে ঘটনাটি হ’\ত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর পরদিন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় হ’\ত্যা মামলা করেন।
ওই মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, আশরাফুল হক ডনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। মামলার অভিযোগে সালমান শাহকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হ’\ত্যা করার কথা বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েও অপেক্ষা
ডনকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানোর দিনেই মামলার তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। ১১ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ আবারও পিছিয়েছে। আদালত আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছে।
এর আগে নির্ধারিত দিনে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে প্রতিবেদন দাখিলের সময় নবমবারের মতো পিছিয়েছে। ফলে একদিকে রিমান্ড-পরবর্তী সময়ে ডনের অবস্থান ও তার বিরুদ্ধে উঠে আসা অভিযোগের যাচাই, অন্যদিকে ২৯ সেপ্টেম্বরের তদন্ত প্রতিবেদন—দুই দিকেই এখন নজর রয়েছে সালমান শাহ হ’\ত্যা মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের।
তদন্ত সংস্থার একটি সূত্র বুধবার বিকেলে ‘আমার দেশ’কে জানিয়েছে, রিমান্ডে পাওয়া তথ্য এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করে দেখা হচ্ছে। ডনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেগুলোও যাচাই শেষে মামলার তদন্তের চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হবে।


