বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে প্রায় দেড় বছর আগে চুরি হয়ে যাওয়া ‘রিঙ-টেইলড’ বা ডোরাকাটা লেজের দুই লেমুর ভারতে পাচার হয়ে গেছে বলে জানতে পেরেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, একাধিক হাত বদলের পর বিপন্ন প্রজাতির ওই দুই লেমুর এখন ভারতের গুজরাতের একটি বেসরকারি বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রয়েছে। সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নিয়েছিল পুলিশ। তবে গাজীপুর সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ দিতে না পারায় লেমুর দু’টি শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরানো যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কারণ, পাচার হওয়া প্রাণী দু’টি যে বাংলাদেশ থেকেই গেছে, সেটি আগে প্রমাণ করতে হবে। আর সেই প্রমাণের সবচেয়ে কার্যকর বৈজ্ঞানিক উপায় হতে পারে প্রাণী দু’টির আগের জেনেটিক প্রোফাইল বা ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের সঙ্গে নতুন করে করা ডিএনএ পরীক্ষার ফল মিলিয়ে দেখা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এটা করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর একটি উপায় হলো, প্রাণিটির আগের জেনেটিক প্রোফাইল বা ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের সঙ্গে নতুন টেস্টের রিপোর্ট মিলিয়ে দেখা।”
কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয়েছে সেখানেই। গাজীপুর সাফারি পার্কের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারত পাচার হয়ে যাওয়া ওই দুই লেমুরের কোনো ডিএনএ রিপোর্ট তাদের কাছে নেই।
তবে বিষয়টি একেবারে আশাহীন নয় বলে মনে করছেন পার্কের কর্মকর্তারা। গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, আরেকটি লেমুরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ওই লেমুরটির সঙ্গে চুরি হয়ে যাওয়া দুই লেমুরের রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সেই পরীক্ষার ফলই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চুরি হয়েছিল যেভাবে
‘রিঙ-টেইলড’ বা ডোরাকাটা লেজের লেমুর বাংলাদেশের স্থানীয় প্রাণী নয়। প্রাণীগুলোর মূল আবাস আফ্রিকা মহাদেশের মাদাগাস্কার দ্বীপ। সেখান থেকে ধরে নিয়ে চোরাকারবারিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করে থাকে। এর ফলে প্রাণীটির অস্তিত্ব ক্রমেই হুমকির মুখে পড়েছে।
২০১৮ সালে বিদেশি পশু-পাখির এমনই একটি অবৈধ চালান ধরা পড়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ম্যাকাও, ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সঙ্গে তখন এক জোড়া ডোরাকাটা লেজের লেমুরও উদ্ধার করা হয়। পরে ওই লেমুর জোড়াকে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে সেই জোড়া লেমুরের ঘরে আরও দু’টি বাচ্চা জন্ম নেয়। বেশ কিছুদিন তারা একসঙ্গে থাকার পর ২০২২ সালের শুরুর দিকে হঠাৎ একটি লেমুর মারা যায়। এর প্রায় তিন বছর পর, ২০২৫ সালের মার্চে অবশিষ্ট তিনটি লেমুরও একসঙ্গে চুরি হয়ে যায়।
গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মি. রহমান বলেন, বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ে কিছু কর্মী তখন পার্কে কাজ করতেন। তাদেরই একজনের সহযোগিতায় একটি চক্র এই চুরির ঘটনা ঘটিয়েছিল।
পরে ওই কর্মীসহ চক্রটির আট সদস্যের মধ্যে ছয়জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। চুরির প্রায় এক মাসের মধ্যে ঢাকার একটি বাসা থেকে তিনটি লেমুরের একটি উদ্ধারও করা হয়।
সিআইডির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা স্বীকার করে যে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বাকি দুই লেমুর ভারতে পাচার করে দেওয়া হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে প্রাণী দু’টিকে ভারতে পাঠানো হয়েছিল বলেও তারা জানায়।
উদ্ধার হওয়া একমাত্র লেমুরটিকে পরে গাজীপুর সাফারি পার্কে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেটিও শেষ পর্যন্ত বাঁচেনি।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মি. রহমান জানান, কয়েক মাস আগে ওই লেমুরটিও হঠাৎ মারা যায়।
কী কারণে সেটি মারা গেল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, লেমুর সাধারণত একা থাকে না; তারা দলবদ্ধভাবে থাকে। দীর্ঘদিন একা থাকার কারণেই শেষ লেমুরটির মৃ’\ত্যু হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন।
ভারতে শনাক্ত হলো যেভাবে
সিআইডি জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় পাওয়া তথ্যের পর থেকেই তারা পাচারের শিকার ডোরাকাটা লেজের দুই লেমুরের বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে আসছিল।
একপর্যায়ে কর্মকর্তারা জানতে পারেন, একাধিক হাত ঘুরে লেমুর দু’টি ভারতের গুজরাতের একটি বেসরকারি বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছেছে।
সিআইডির একজন কর্মকর্তা জানান, ওই কেন্দ্রটির নাম ভান্তারা। প্রতিষ্ঠানটি ভারতের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী আম্বানি পরিবারের মালিকানাধীন।
তথ্যটি কতটা সঠিক, তা যাচাই করতে সিআইডি লেমুর দু’টির ছবি ও ভিডিও সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। এর মধ্যেই একদিন তারা দেখতে পান, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভান্তারা কর্তৃপক্ষ লেমুরগুলোর ভিডিও প্রকাশ করেছে।
ভান্তারা নামে একটি ফেসবুক পেজে, যার প্রায় ১০ লাখ অনুসারী রয়েছে, কয়েক মাস আগে ডোরাকাটা লেজের লেমুরের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
ভিডিওতে বেশ কয়েকটি লেমুরকে একসঙ্গে দেখা যায়। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া লেমুর রয়েছে—সিআইডি কর্মকর্তারা সেটি কীভাবে নিশ্চিত হলেন?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, ভিডিওটি পাওয়ার পর সেটি গাজীপুর সাফারি পার্কের কর্মকর্তাদেরও দেখানো হয়। পার্কের কর্মকর্তারা প্রাণীগুলোকে দীর্ঘদিন কাছ থেকে দেখেছেন। পরে তারাই মোটামুটিভাবে নিশ্চিত করেন যে, বাংলাদেশের চুরি যাওয়া দুই লেমুরও সেখানে রয়েছে।
ফেরত আসবে কি?
দুই লেমুরকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে পরে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ পুলিশ। কিন্তু ফেরত আনার দাবির পক্ষে তথ্য-প্রমাণ চেয়ে পাঠানোর পর বিষয়টি নতুন জটিলতায় পড়ে।
একপর্যায়ে দেখা যায়, কিছু ছবি ও ভিডিও ছাড়া গাজীপুর সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের হাতে এমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই, যার ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—ভারতে থাকা ওই দুই লেমুরই বাংলাদেশ থেকে চুরি যাওয়া প্রাণী।

