গরমের তীব্রতা বাড়ার মধ্যেই হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট। একই সময়ে বন্ধ রয়েছে আরএনপিএলের একটি ইউনিটও। দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের একযোগে অচল হয়ে পড়ায় নতুন করে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পুরোনো সংকটের সঙ্গে এই নতুন ঘাটতি যোগ হওয়ায় দেশে মোট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছাড়িয়ে গেছে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট।
একদিকে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে গরম বাড়ছে, অন্যদিকে যান্ত্রিক ও কারিগরি ত্রুটির কারণে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হয়ে উঠছে। কয়েক সপ্তাহ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও তীব্র লোডশেডিং শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই সময় দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের দিকেই এগোচ্ছে। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা দেখানো হয় ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট, যা সর্বোচ্চ চাহিদার তুলনায় অন্তত ১ হাজার মেগাওয়াট কম। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছিল ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট, যা স্বাভাবিক উৎপাদন পরিস্থিতির তুলনায় অন্তত ১ হাজার থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট কম।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে নানা ধরনের সংকটের মধ্যেও ১৪ হাজার থেকে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের নজির রয়েছে। কিন্তু এবার উৎপাদন হঠাৎ এতটা কমে যাওয়ার পেছনে একসঙ্গে একাধিক কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়াকেই বড় কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলামের বক্তব্যেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তিনি জানান, হঠাৎ করে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। সেটি দ্রুত মেরামতের চেষ্টা চলছে। একই সময়ে আরএনপিএলের একটি ইউনিটও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দুই কেন্দ্র মিলিয়ে নতুন করে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আগের সমস্যাগুলোও বিদ্যমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বুধবার রাত ১১টার দিকে আদানির বিদ্যুৎ উৎপাদন হঠাৎ ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৭৫৮ মেগাওয়াটে নেমে আসে। একই সময়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদনও কমে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াটে। একদিন আগেও এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছিল ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
শুধু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রই নয়, একই সময়ে কয়েকটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। আশুগঞ্জে ৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র একদিন আগেও ৩১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল। কিন্তু কারিগরি ত্রুটির কারণে সেটিও বন্ধ হয়ে পড়েছে।
এর পাশাপাশি গ্যাস সংকটের কারণে শুধু ঢাকা অঞ্চলের অন্তত সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ অথবা স্বল্প সক্ষমতায় চলছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেও একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। ফলে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কমে যাওয়ার চাপ আরও বেড়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে গ্রাহকদের ওপর। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে কিছুটা কমে আসা লোডশেডিং আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। শহরাঞ্চলে দিনে চারবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। আর গ্রামাঞ্চলে ফিরে এসেছে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং—কোথাও কোথাও দিনে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
ফলে গরমের তীব্রতার মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের এই নতুন সংকট জনজীবনে আরও চাপ তৈরি করেছে। একদিকে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা, অন্যদিকে একের পর এক উৎপাদন ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহের ঘাটতিও বাড়ছে। পুরোনো সংকটের সঙ্গে নতুন করে যোগ হওয়া ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
