আসাম, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের পর এবার পশ্চিমবঙ্গেও অনুমোদনহীন মাদরাসা বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে বিজেপি সরকার। রাজ্যে প্রথম দফায় ২৫২টি অনুমোদনহীন মাদরাসা সম্পূর্ণ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১০০টি মাদরাসাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিস পাঠানো হয়েছে।
কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের ২২টি জেলায় সংখ্যালঘু ও মাদরাসা শিক্ষা দপ্তরের উদ্যোগে গত ২২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এক সমীক্ষায় রাজ্যজুড়ে প্রায় ২ হাজার ৩৯৬টি মাদরাসা অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। সমীক্ষার পর এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, পরিকাঠামোগত ঘাটতি, পাঠক্রমে ত্রুটি, প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাব এবং পড়ুয়াদের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অসংগতির মতো কারণ সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট জেলা শাসকদের কাছে মাদরাসাগুলো বন্ধের নোটিস পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, যেসব প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে, তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব বা নথি দিতে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার-এর এই সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়নমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, যেসব মাদরাসার যথাযথ অনুমোদন রয়েছে, সেগুলোর কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা দেওয়া হবে না।
তবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যও সামনে এসেছে। বিজেপি নেতারা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যত্রতত্র অনুমোদনহীন মাদরাসা খুলে কোনো ধরনের ‘উৎপাত’ সরকার বরদাশত করবে না।
বিজেপির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অতীতে মাদরাসার শিক্ষক পরিচয়ে উগ্রপন্থি ধরা পড়ার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে দেশবিরোধী কার্যকলাপ পরিচালনার অভিযোগও সামনে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব কারণেই সরকার কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে দলটির নেতারা যুক্তি দিয়েছেন।
অন্যদিকে, সরকারি এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ইতোমধ্যে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিকে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া একটি রুটিন পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হলেও মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকে এই সিদ্ধান্তকে সাম্প্রদায়িক বৈষম্য এবং নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নেওয়া রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন।
তাদের বক্তব্য, পরিকাঠামোগত ঘাটতি কিংবা অনুমোদনের অভাব রাজ্যের অন্যান্য ধর্মীয় ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও থাকতে পারে। কিন্তু কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বেছে নিয়ে এভাবে একযোগে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলে তা বৈষম্যমূলক বলেই বিবেচিত হবে।
আসাম, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড-এর মতো বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোর পদক্ষেপের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের এই সিদ্ধান্তের মিলও টানা হচ্ছে। ফলে মাদরাসা বন্ধের এই উদ্যোগ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। আগামী দিনে এই পদক্ষেপ রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রশাসনের নিরাপত্তা ও নিয়ম মেনে চলার যুক্তির বিপরীতে বৈষম্যের অভিযোগ—দুই পক্ষের এই অবস্থান ঘিরেই এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।


