দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে মুসলিমদের ইবাদতের জন্য বর্তমানে রয়েছে ৭২টি সুসজ্জিত মসজিদ। ইসলামিক ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য দেশটিতে রয়েছে ছয়টি পূর্ণাঙ্গ মাদ্রাসা। এর মধ্যে ৬৯টি মসজিদ ও তিনটি মাদ্রাসার হিসাব পরিচালনা, কর্মীদের বেতন ব্যবস্থাপনা এবং পে-স্লিপ তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজের জন্য ব্যবস্থাপনা সেবা দিয়ে থাকে সিঙ্গাপুরের ইসলামিক রিলিজিয়াস কাউন্সিল অব সিঙ্গাপুরের (মুইস) অধীনে পরিচালিত মসজিদ-মাদ্রাসা-ওয়াকফ শেয়ার্ড সার্ভিসেস কমিটি।
এই ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত একটি সফটওয়্যারে র্যানসমওয়্যার হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে মসজিদ ও মাদ্রাসার কর্মীদের বেতন, ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। একই সঙ্গে বেতন প্রক্রিয়াতেও বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। দ্য স্ট্রেইটস টাইমস জানিয়েছে, হামলার পর আক্রান্ত সিস্টেম ও এর ব্যাকআপ এনক্রিপ্ট করে দেওয়া হয়।
সিঙ্গাপুরের মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোর এই প্রশাসনিক অবকাঠামোতে ব্যবহৃত সফটওয়্যারটির নাম স্মার্টএইচআরএমএস। এটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান অ্যাভেলজিকের সরবরাহ করা একটি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা।
প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নোটিশ অনুযায়ী, গত ৩০ ও ৩১ আগস্ট সন্দেহজনক হামলাকারীর কার্যক্রম প্রথম শনাক্ত করা হয়। এরপর আক্রান্ত সিস্টেমের কার্যক্রম ও এর ব্যাকআপ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেয়।
সিঙ্গাপুরের মুইস জানিয়েছে, তারা আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো, সফটওয়্যার সরবরাহকারী অ্যাভেলজিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে। তবে ঠিক কতগুলো মসজিদ ও মাদ্রাসা এই হামলার প্রভাবে পড়েছে, তা মুইস প্রকাশ করেনি। একইভাবে কী ধরনের সংবেদনশীল তথ্য ক্ষতিগ্রস্ত বা আপসকৃত হয়েছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
চলমান তদন্তের কারণে হামলাকারীদের কোনো মুক্তিপণ দেওয়া হয়েছে কি না কিংবা আক্রান্ত তথ্য ও সিস্টেম পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কি না—এসব বিষয়েও মুইস কোনো মন্তব্য করেনি।
বেতন ও ব্যাংক তথ্যও ছিল আক্রান্ত ব্যবস্থায়
আক্রান্ত ব্যবস্থায় সিঙ্গাপুরের কয়েক ডজন মসজিদ ও মাদ্রাসার কর্মীদের নাম, যোগাযোগের তথ্য, বেতন এবং ব্যাংক হিসাব নম্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকার কথা জানা গেছে। ফলে সাইবার হামলার পর কর্মীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হামলার কারণে হিসাবরক্ষণ বিভাগের কর্মীরা সফটওয়্যারটিতে প্রবেশ করতে না পারায় কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে বেতন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোথাও কোথাও ম্যানুয়ালি বেতন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করতে হয়েছে।
অর্থাৎ হামলার প্রভাব শুধু তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রমেও তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়েছে।
তদন্ত শুরু করেছে অ্যাভেলজিক
সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান অ্যাভেলজিক জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি সিঙ্গাপুর পুলিশ এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা কমিশন বা পিডিপিসিকে জানিয়েছে। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ করে ঘটনার ফরেনসিক তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে বিপুল পরিমাণ তথ্য চুরি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে সিস্টেম এবং ব্যাকআপ এনক্রিপ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে অ্যাভেলজিক জানিয়েছে।
বর্তমানে আক্রান্ত সেবা পুনরুদ্ধারের কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সিস্টেমটি পুনরায় চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জনসাধারণের সেবা চালু রাখার বিকল্প ব্যবস্থা
মুইস জানিয়েছে, এই সাইবার হামলায় মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলো থেকে জনসাধারণের জন্য সরাসরি দেওয়া সেবাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বেতন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম চালু রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
আক্রান্ত কর্মীদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে মুইস। সফটওয়্যার পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা এবং নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের মুসলিম শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিসর
সিঙ্গাপুরে মুসলিমদের ধর্মীয় ও শিক্ষাগত কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে ঘিরে পরিচালিত হয়। দেশটিতে বর্তমানে ৭২টি মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে সুলতান মসজিদ কাম্পং গ্ল্যাম এলাকায় অবস্থিত দেশটির সবচেয়ে বিখ্যাত এবং অন্যতম প্রাচীন ঐতিহাসিক মসজিদ।
ট্যাম্পিনিস এলাকায় অবস্থিত দারুল গোফরান মসজিদ ধারণক্ষমতার দিক থেকে সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় মসজিদ। সেখানে একসঙ্গে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।
চাইনাটাউনে অবস্থিত জামে মসজিদও সিঙ্গাপুরের অত্যন্ত পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী মসজিদগুলোর একটি। অন্যদিকে লিটল ইন্ডিয়া এলাকায় অবস্থিত আবদুল গফুর মসজিদ তার চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সিঙ্গাপুরে রয়েছে ছয়টি প্রধান ফুল-টাইম মাদ্রাসা। এগুলো হলো মাদ্রাসা আলজুনাইদ আল-ইসলামিয়াহ, মাদ্রাসা আল-ইরসিয়াদ জুহরি আল-ইসলামিয়াহ, মাদ্রাসা আল-মাআরিফ আল-ইসলামিয়াহ, মাদ্রাসা আল-ওয়াকফ আল-ইসলামিয়াহ, মাদ্রাসা আল-আরবিয়াহ আল-ইসলামিয়াহ এবং মাদ্রাসা আলসগোফ আল-ইসলামিয়াহ।
এসব পূর্ণকালীন মাদ্রাসার বাইরে সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন মসজিদেও খণ্ডকালীন ইসলামিক শিক্ষা দেওয়া হয়। সপ্তাহান্তে কোরআন ও দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
এই বিস্তৃত মসজিদ, মাদ্রাসা ও ওয়াকফ ব্যবস্থাপনার একটি অংশের কর্মীদের বেতন ও মানবসম্পদ সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত ও পরিচালিত হওয়ায় সাম্প্রতিক র্যানসমওয়্যার হামলাটি প্রশাসনিক অবকাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিঘ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত মুইস জানিয়েছে, সাধারণ মুসল্লি ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি দেওয়া সেবাগুলো এই ঘটনায় বন্ধ হয়নি। বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে বেতন ও মানবসম্পদ কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে এবং একই সঙ্গে অ্যাভেলজিক আক্রান্ত সিস্টেম পুনরুদ্ধারে কাজ করছে।
সূত্র: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস


