ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ‘সঠিক ছিল’—আসিফ নজরুল

ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল (Asif Nazrul)। তার ভাষ্য, বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বিদেশি দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা সে সময় বলা হলেও, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের বিভিন্ন উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত সেই শঙ্কা দূর হয়েছিল। সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল বলেও দাবি করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা জানান আসিফ নজরুল।

পোস্টের শুরুতে তিনি লেখেন, ‘টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: কেন ভারতে যাইনি?’ এরপর ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের দায় নিজের ওপর নিয়েই তিনি বলেন, ‘ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি তখনকার ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে মূলত আমারই ছিল। আমি নিজেই এ কথা একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছি। তাই এতদিন পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিষয়টি তদন্ত করে তা প্রকাশের কী এমন কারণ ঘটলো বুঝলাম না।’

ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, সেটিও নিজের বক্তব্যে তুলে ধরেছেন তিনি। আসিফ নজরুলের দাবি, উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে অপমানজনকভাবে বাদ দেওয়ার ঘটনার পরই পরিস্থিতি বদলে যায়।

তিনি লেখেন, ‘ঘটনার সূত্রপাত উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে মুস্তাফিজুর রহমান (Mustafizur Rahman)-কে আইপিএল থেকে অপমানজনকভাবে বাদ দেওয়া থেকে। এর পরপরই আমরা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এবং বাংলাদেশের প্রতি অবমাননার প্রতিবাদে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার বিষয়ে অনীহা জানাই।’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC)-এর একটি রিপোর্টের প্রসঙ্গও টেনেছেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তার দাবি, বাংলাদেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আশঙ্কা অমূলক ছিল না এবং আইসিসির প্রথম রিপোর্টেই তার প্রতিফলন ছিল।

আসিফ নজরুল লেখেন, ‘আমাদের আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, আইসিসির প্রথম রিপোর্টেই তার স্বীকৃতি ছিল। সেখানে ভারতে নিরাপত্তা-আশঙ্কার তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল—বিশ্বকাপের দলে মুস্তাফিজ থাকলে, বাংলাদেশের সমর্থকরা মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করলে এবং বাংলাদেশে নির্বাচন এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিবিসি বাংলা (BBC Bangla) ওই রিপোর্টের হুবহু বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছিল। এরপর প্রশ্ন রেখে আসিফ নজরুল লেখেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমরা ভারতে খেলতে যাব কেন?’

ভারতের পরিবর্তে অন্য কোনো ভেন্যুতে বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ চেষ্টা করেছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, এ বিষয়ে কয়েকটি দেশের সমর্থনও পাওয়া গিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

আসিফ নজরুল লেখেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো ভেন্যুতে বিশ্বকাপ খেলার জন্য বহু চেষ্টা করেছি। কোনো কোনো দেশ থেকে সমর্থনও পেয়েছিলাম। কিন্তু সম্ভবত আইসিসির নেতৃত্বে ভারতীয়দের আধিপত্যে থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।’

তবে আইসিসির নেতৃত্ব নিয়ে তার এই বক্তব্যটি আসিফ নজরুলের নিজস্ব মূল্যায়ন হিসেবেই পোস্টে উঠে এসেছে।

ভারতে বাংলাদেশ দলকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তার মতে, সে সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে তিনটি বিষয় প্রধান বিবেচনায় ছিল।

তিনি লেখেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদেরকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। আমাদের সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি বিষয় ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—দেশের মর্যাদা, আমাদের ক্রিকেটার-সাংবাদিক-সমর্থকদের নিরাপত্তা এবং আগামী নির্বাচনের আগে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা।’

বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়েও সে সময় নানা আশঙ্কার কথা উঠেছিল বলে উল্লেখ করেন আসিফ নজরুল। বিশেষ করে বিদেশি দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বা অন্যান্য ক্রিকেটীয় যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে—এমন কথাও বলা হয়েছিল।

তিনি লেখেন, ‘সে সময় বলা হয়েছিল, বিশ্বকাপ না খেললে বিদেশি দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (Bangladesh Cricket Board)-এর নানা উদ্যোগে সেই আশঙ্কাও শেষ পর্যন্ত দূর হয়েছিল।’

সবশেষে নিজের অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানান সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। একটি ছোট দেশ বলে কেউ আমাদের ইচ্ছেমতো অপমান করবে, আর আমরা সবসময় তা মুখ বুঝে মেনে নেব—এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়।’

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন আসিফ নজরুল। তিনি লেখেন, ‘আমি সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারত (India)-এর সঙ্গে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী। মাথা নত করে সব মেনে নেওয়াতে না।’