Description:
জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক সমীকরণে এখন সবচেয়ে বড় অস্বস্তির নাম হয়ে উঠেছে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। আসন বণ্টন নিয়ে দীর্ঘ দরকষাকষি, অনড় অবস্থান এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমঝোতায় না আসার কারণে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট কার্যত চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। নির্ধারিত আসন সংখ্যায় সন্তুষ্ট হতে না পারায় ইসলামী আন্দোলন নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জানায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জামায়াতের ওপর, ফলে বিকাল ৪টায় পূর্বনির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন শেষ পর্যন্ত স্থগিত করতে বাধ্য হয় দলটি।
জানা গেছে, শুরুতে জামায়াতের পক্ষ থেকে চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ৪০টি আসনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এই প্রস্তাবকে তারা তাদের রাজনৈতিক শক্তি ও ভোটব্যাংকের তুলনায় অপ্রতুল মনে করে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তী দুই দিনে একাধিক দফায় বৈঠক ও দরকষাকষির পর জামায়াত আরও ৫টি আসন বাড়িয়ে মোট ৪৫টি আসনে সম্মতি জানায়। শুধু তাই নয়, পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত আরও ৫টি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে আলোচনার সুযোগ থাকে। কিন্তু এতসব ছাড় দেওয়ার পরও চরমোনাই পীর সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক সাড়া দেননি।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এর আগেই জামায়াত কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে ডজনখানেক আসনে নিজেদের প্রার্থী দেয়নি। ওই সব আসন কার্যত চরমোনাইয়ের দলের জন্য নিশ্চিত করে রাখা হয়েছিল। সেই ছাড় দেওয়ার পরও ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে নতুন করে বেশি আসনের দাবিতে অনড় থাকায় জামায়াতের ভেতরে তীব্র অস্বস্তি ও চাপ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক মহলে এই পরিস্থিতিকে জামায়াতের জন্য এক ধরনের ‘গলার কাঁটা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা সহজে কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এবং খেলাফত মজলিস—এই তিনটি দলই ১১ দলীয় জোটে থাকা না থাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে নিজ নিজ কার্যালয়ে সর্বোচ্চ ফোরামের বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছিল। প্রতিটি দলই নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, সাংগঠনিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানিয়েছে, চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বের বিশ্বাস, দেশব্যাপী তাদের একটি বিস্তৃত ও সুসংগঠিত ভোটব্যাংক রয়েছে। এই বিশ্বাস থেকেই তারা নিজেদের শক্ত অবস্থানে ধরে রেখে আরও বেশি আসনের দাবিদার হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে। তাদের মতে, কম আসনে সন্তুষ্ট হলে ভবিষ্যতে দলীয় সমর্থকদের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে। এই অবস্থানে তারা দৃঢ় থাকায় একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
চাহিদামতো আসন না পাওয়ার প্রেক্ষাপটে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আলোচনায় এসেছে ইসলামী আন্দোলনের মজলিসে শূরার বৈঠকে। ওই বৈঠকে দলটির ভেতরে স্পষ্ট মতবিরোধ দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। একাংশ মনে করছে, সম্মানজনক আসন নিশ্চিত না হলে জোটে থাকা অর্থহীন। অন্য একটি অংশ শেষ পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার এবং সম্ভাব্য সমঝোতার সুযোগ খোলা রাখার পক্ষে মত দিচ্ছে। এই দ্বিধাবিভক্ত অবস্থানই দলটির সিদ্ধান্তকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতার তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি আসন দাবি করছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। জামায়াত তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আগের প্রস্তাবের চেয়ে বাড়িয়ে ১৫ থেকে ২০টি আসন দেওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিলেও দলটির শীর্ষ পর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এই প্রস্তাবেও তারা সন্তুষ্ট নয়। ফলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জোট ত্যাগ করা প্রায় নিশ্চিত বলেই ধারণা করা হচ্ছে, যা ১১ দলীয় জোটের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
অন্যদিকে মওলানা আব্দুল বাসিত আজাদ ও আহমাদ আব্দুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিসের অবস্থান তুলনামূলকভাবে নমনীয় বলে জানা গেছে। দলটির দাবির প্রেক্ষিতে জামায়াত শুরুতে ৭টি আসনের প্রস্তাব দিলেও পরবর্তীতে আরও ৩টি আসন বাড়িয়ে মোট ১০টি আসনে সম্মতি জানাতে চায়। এ বিষয়ে দলটির কার্যালয়ে সর্বোচ্চ ফোরামের বৈঠক চলমান রয়েছে। দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, এই খেলাফত মজলিসের জোটে থাকার সম্ভাবনাই বেশি, কারণ তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে আগ্রহী।
সব মিলিয়ে আসন বণ্টনকে কেন্দ্র করে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এখন এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কে থাকবে, কে বেরিয়ে যাবে—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে আগামী কয়েক ঘণ্টা কিংবা দিনের আলোচনার ওপর। তবে বর্তমান বাস্তবতায় চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন জামায়াতের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চাপের নাম হয়ে উঠেছে—এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে খুব একটা দ্বিমত নেই।


