বরিশাল বিভাগে আসন্ন নির্বাচনের সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে ইসলামি দলগুলোর জোট ভেঙে যাওয়া। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (Islami Andolan Bangladesh) ও জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami) এই ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে ইসলামি ও সমমনা দলগুলোর সমঝোতা ভেঙে পড়ার পর বরিশালের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে এই দুই দল কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে চলে গেছে। এমনকি বিভাগের বাকি ১৪টি আসনেও তাদের সাংগঠনিক ও ভোটব্যাংকের প্রভাব প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় পুরো বরিশাল বিভাগে বিএনপি (BNP) এগিয়ে যাচ্ছে প্রায় বিনা বাধায়।
বছরের শুরুতে ইসলামি ও সমমনা আটটি দল নিয়ে যে জোটের ঘোষণা এসেছিল, তার নেতৃত্বে ছিল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে সেই জোটে এনসিপি, এবি পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল যুক্ত হয়। নির্বাচনি মাঠে এই জোটকেই বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। কিন্তু আসন ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত জোটকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। শুক্রবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এককভাবে ২৬৮ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণার মধ্য দিয়েই জোট ভাঙনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
জোট ভাঙার বড় ধাক্কা: সাতটি আসনে হোঁচট
বরিশালের যে সাতটি আসনে বিএনপি ও ইসলামি দলগুলোর মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, সেখানে এখন জামায়াত ও চরমোনাইভিত্তিক রাজনীতি দুর্বল অবস্থানে। সংগঠিত জোটের শক্তি না থাকায় এসব আসনে ইসলামি প্রার্থীরা কার্যত একা হয়ে পড়েছেন।
পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী মরহুম দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (Delwar Hossain Sayeedi)-এর পুত্র মাসুদ সাঈদী। অতীতে এই আসনে সাঈদী প্রথমবার এককভাবে নির্বাচন করে মাত্র ২৮০ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হয়ে তিনি সাড়ে ছয় হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আসনে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়িয়েছে বিএনপি, আর ইসলামী আন্দোলনের জোট থেকে সরে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
পিরোজপুর-২ আসনে জামায়াত প্রার্থী শামিম সাঈদী চরমোনাইর সমর্থনের কারণে শুরুতে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। নিরপেক্ষ নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতের ভোট সাধারণত তিন থেকে চার হাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ইসলামী আন্দোলনের ভোট যুক্ত হলে এখানে ভিন্ন সমীকরণ তৈরি হতে পারত। কিন্তু জোট ভেঙে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে। ফলে বিএনপি প্রার্থী আহম্মেদ সোহেল সুমন মঞ্জুর এখন অনেকটাই স্বস্তিতে।
পটুয়াখালী-২ আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ ব্যক্তিগত ইমেজে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেও জোট ভাঙনের কারণে তার অবস্থান দুর্বল হয়েছে। অতীতে নিরপেক্ষ নির্বাচনে এখানে জামায়াতের ভোট পাঁচ হাজারের ঘর ছুঁতে পারেনি। ইসলামী আন্দোলনের সমর্থন না থাকায় এখন বিএনপি প্রার্থী শহিদুল আলম তালুকদারের বিপরীতে মাসুদের জয় অনেকটাই অনিশ্চিত।
পিরোজপুর-৩ আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী রুস্তুম আলী ফরাজীর আদর্শিক অবস্থান নিয়েই শুরু থেকে প্রশ্ন ছিল। জামায়াতের ভোট না পাওয়ায় তিনি শুরুতেই পিছিয়ে পড়েছেন।
বরিশাল-৫, বরিশাল-৬ ও পটুয়াখালী-৪—এই তিনটি আসন ইসলামী আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। বরিশাল সদর ও বাকেরগঞ্জে দলটির নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করিম প্রার্থী হয়েছেন। পটুয়াখালী-৪ আসনে বিএনপির সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমান হাতপাখা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অতীতে এসব এলাকায় জামায়াতের ভোটব্যাংকের বড় ভূমিকা ছিল। জোট ভাঙনের ফলে সেই সমর্থন হারিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধার কমে গেছে।
বাকি ১৪ আসনেও প্রভাব তলানিতে
এই সাতটি আসনের বাইরে বরিশাল বিভাগের বাকি ১৪টি আসনেও ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের প্রভাব নেমে এসেছে তলানিতে। ভোটারদের প্রত্যাশা ছিল, একসঙ্গে থাকলে ইসলামি দলগুলো বিএনপির সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করতে পারবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি ফিকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী আন্দোলনের জোট ত্যাগ এবং জামায়াতের একক প্রার্থিতার সিদ্ধান্ত পুরো বরিশাল বিভাগে বিএনপির পথ অনেকটাই পরিষ্কার করে দিয়েছে। একদিকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা, অন্যদিকে বিএনপির পুনর্গঠিত শক্ত ঘাঁটি—তার সঙ্গে ইসলামি দলগুলোর ছন্নছাড়া অবস্থান মিলিয়ে বরিশালে এখন বিএনপির ‘স্বস্তির জয়’ যেন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
Tags: Islami Andolan Bangladesh, Jamaat-e-Islami, BNP, Delwar Hossain Sayeedi, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী
