‘আমেরিকান ড্রিম’ পূরণের আশায় বসতভিটা, জমি, গয়না বিক্রি কিংবা চড়া সুদের ঋণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন ৩৬ জন বাংলাদেশি। জনপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা, কারও ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতির বাস্তবতায় খালি হাতে দেশে ফিরতে হয়েছে তাঁদের সবাইকে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে এই ৩৬ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়। দুপুর ১২টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ সামরিক বিমানে এক নারীসহ ৩৬ জন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম (BRAC Migration Programme)।
ব্র্যাক জানায়, উন্নত জীবনের স্বপ্নে প্রবাসে পাড়ি দিতে গিয়ে কেউ বসতভিটা ও পরিবার-পরিজনের জমি বিক্রি করেছেন, কেউ আবার গয়না বিক্রি কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়েছেন। এভাবে কেউ ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা, আবার কেউ ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও এভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) সহযোগিতায় ব্র্যাকের পক্ষ থেকে ফেরত আসা এসব কর্মীকে পরিবহনসহ জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ফেরত আসা ৩৬ জনের মধ্যে নোয়াখালী জেলার বাসিন্দাই ২১ জন। এছাড়া লক্ষ্মীপুরের দুইজন এবং মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, লালমনিরহাট, শরীয়তপুর, বরগুনা, ফেনী, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও নেত্রকোনা জেলার একজন করে নাগরিক রয়েছেন। এই নিয়ে ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৩ জনে।
ব্র্যাক জানায়, ফেরত আসা এই ৩৬ জনের অধিকাংশই প্রথমে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো—বিএমইটি (BMET)—এর ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। সেখানে আশ্রয়ের আবেদন করলেও দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন প্রশাসন।
নোয়াখালীর ফেরত আসা জাহিদুল ইসলাম জানান, দক্ষিণ আমেরিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আশায় তিনি দালালদের হাতে তুলে দেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা। গাজীপুরের সুলতানা আক্তার, যিনি এই দলে একমাত্র নারী সদস্য, জানান, ব্রাজিল হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত পার হতে দালালদের দিয়েছেন ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব অর্থই বৃথা গেছে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান নোয়াখালীর মির হাসান, যিনি খরচ করেছিলেন ৫৫ লাখ টাকা, রিয়াদুল ইসলাম ৫০ লাখ এবং রাকিব ৬০ লাখ টাকা। এত বিপুল অর্থ ব্যয় করেও তাঁদের সবার ভাগ্যে জুটেছে খালি হাতে দেশে ফেরা।
এ প্রসঙ্গে শরিফুল হাসান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যারা ফেরত এসেছেন, তাঁদের বড় একটি অংশ প্রথমে ব্রাজিলে গিয়েছেন এবং সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। সরকার যখন ব্রাজিলে বৈধভাবে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দেয়, তখন তারা প্রকৃতপক্ষে ব্রাজিলে কাজ করতে যাচ্ছেন নাকি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্রাজিলকে ব্যবহার করছেন—সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি। একেকজন ৪০ থেকে ৫৫ লাখ টাকা খরচ করে শূন্য হাতে ফিরে আসছেন—এই দায় কার, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, যেসব এজেন্সি এই কর্মীদের পাঠিয়েছে এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যারা যুক্ত ছিল, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
শরিফুল হাসান আরও জানান, ২০২৫ সালে বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে মোট ১ হাজার ৩২০ জন বাংলাদেশি ব্রাজিলে গেছেন, যার মধ্যে নোয়াখালী জেলারই ৯৫১ জন। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁদের একটি বড় অংশ মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। নতুন করে ব্রাজিলে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেওয়ার আগে সরকারকে আরও সতর্ক হওয়া উচিত বলেও তিনি মত দেন।

