রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অধীনে গড়ে ওঠা পূর্বাচল নতুন শহর এখনো পূর্ণাঙ্গ নগররূপ পায়নি। বাস্তবতা হলো—বেশির ভাগ এলাকা এখনো কার্যত বিরানভূমি। হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ি নির্মিত হলেও এমন অনেক অঞ্চল রয়েছে, যেখানে দিনের বেলাতেও মানুষ পা বাড়াতে ভয় পায়। অথচ এই বাস্তবতার মধ্যেই পানি সরবরাহ ও প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। অসম ও বিতর্কিত এক চুক্তির মাধ্যমে শুধু একটি প্রকল্পেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধের দায় রাজউকের। এর বাইরে আগামী ১১ বছর ধরে প্রতি বছর ৫৭ কোটি টাকা করে কার্যক্রম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করবে সংস্থাটি। ফলে শুধু রক্ষণাবেক্ষণ খাতেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পাবে ৬২৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এই প্রকল্পে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ২১৯ কোটি টাকায়।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এমন একটি অসম চুক্তির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ তছরুপের পথ তৈরি করা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক (পিডি), প্রকল্প ম্যানেজার এবং চুক্তি প্রণয়নের সময় যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন—তাঁরা সবাই বহাল তবিয়তে রয়েছেন। শুধু তাই নয়, গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের পুরস্কৃতও করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রকল্পের অসম চুক্তি ও অনিয়ম তদন্তের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব ড. আরিফুল হককে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সদস্য সচিব করা হয় পূর্বাচল পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ বদিউল আলমকে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকল্পের অনিয়ম তুলে ধরার পরিবর্তে উল্টো নিজেদের পক্ষে সাফাই গাওয়া হয়েছে এবং প্রকল্পকে ইতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পুরস্কার হিসেবে গত নভেম্বরে প্রকল্পের নির্মাণ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আটজনের একটি বহর নিয়ে কোম্পানির খরচে তিনি চীন সফর করেন।
ওই সফরকারী দলে ছিলেন—রাজউকের সদস্য (এস্টেট অ্যান্ড ল্যান্ড) শেখ মতিয়ার রহমান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব, রাজউকের সদস্য মো. বশিরুল হক ভূঁইয়া, রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম, রাজউকের পরিচালক আবু কাউসার মল্লিক, মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বশির আহমেদ এবং পূর্বাচল পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রজেক্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসাইন।
রাজউকের নথি অনুযায়ী, পূর্বাচল প্রকল্পে পানি সরবরাহের জন্য ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর রাজউকের সঙ্গে ইউনাইটেড ডেলকট (United Delcot) কোম্পানির চুক্তি হয়। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কাঠামোর আওতায় প্রথম চার বছরে রাজউক বিনিয়োগ করছে ২৯৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা, আর বাকি বিনিয়োগের দায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের।
কিন্তু গ্রাহকসংখ্যা যা-ই থাকুক না কেন, প্রথম পর্যায়ে পানির সংযোগ চালু হওয়ার পর প্রতি বছর রক্ষণাবেক্ষণের নামে ঠিকাদারকে দিতে হবে ৫৭ কোটি টাকা। ১১ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পে শুধু রক্ষণাবেক্ষণ বাবদই প্রতিষ্ঠানটি পাবে ৬২৭ কোটি টাকা। অথচ এই সময়ে পানি বিক্রি করে বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উঠে আসা বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কাজের সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো বলছে, রাজউকের দেওয়া অর্থ দিয়েই প্রথম পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারের বিনিয়োগ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োজন হয়নি।
জানা গেছে, ডেলকট একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে একটি চীনভিত্তিক কোম্পানির অংশীদারত্ব রয়েছে। ডেলকট মূলত ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানিনির্ভর ব্যবসা করে। পূর্বাচল প্রকল্প পাওয়ার আগে তাদের পানি সরবরাহ প্রকল্পে বাস্তব কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।
প্রকল্প নথি অনুযায়ী, বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয়েছে ১৫ বছর—চার বছর নির্মাণকাজ এবং পরবর্তী ১১ বছর কার্যক্রম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ। প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ দেখিয়ে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়। নথিতে দাবি করা হয়েছে, দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজও শেষের পথে। যদিও সরেজমিনে গিয়ে সেই তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। চুক্তি অনুযায়ী গত দুই বছরের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ রাজউক ইতোমধ্যে ঠিকাদারকে দুই কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ করেছে বলে ডেলকটের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
২০২৪ সালের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শেষে পানির সংযোগ দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৮৮টি বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ১১ হাজারের বেশি প্লটে সংযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও তা কবে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। কালবেলা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত একাধিক বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা সবাই জানিয়েছেন, পানির লাইন টানা হলেও এখনো সংযোগ দেওয়া হয়নি।
১৩ নম্বর সেক্টরের এক বাড়ির মালিক বলেন, অনেক দিন ধরে লাইন বসানো হলেও পানির দেখা নেই। কবে সংযোগ মিলবে, সে বিষয়ে কেউ কোনো স্পষ্ট তথ্য দিচ্ছে না।
প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সেক্টরে ১৫টি গভীর নলকূপ স্থাপন এবং ৩২০ কিলোমিটার পাইপলাইন নেটওয়ার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। চার বছরে চারটি ফেজে কাজ বাস্তবায়নের কথা—প্রথম ফেজে ৪০ কিলোমিটার, দ্বিতীয় ফেজে ১০০ কিলোমিটার, তৃতীয় ফেজে ১০০ কিলোমিটার এবং চতুর্থ ফেজে ৮০ কিলোমিটার।
রাজউকের নথিতে দাবি করা হয়েছে, প্রথম ফেজে সব কাজ শেষ হয়েছে এবং প্রায় ২ হাজার ৬০০ প্লটে লাইন বসানো হয়েছে। সেক্টর ১, ২, ৩ ও ৪-এর (আংশিক) আবেদনের পর ১৮৫ জনকে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ফেজে একাধিক সেক্টরে কাজ চলমান থাকলেও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব অনিয়ম উপেক্ষা করে বলা হয়েছে, সব কাজ সঠিকভাবেই চলছে। এমনকি দ্বিতীয় ফেজের কাজ গত ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ এলাকায় কাজ শুরুই হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কাজ শেষ করতে আরও দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রথম ফেজের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হলে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ নির্দিষ্ট হারে অর্থ দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এখন পর্যন্ত আয়ের কোনো নিশ্চিত ভিত্তি তৈরি হয়নি। মাত্র ১৮৮টি সংযোগ থেকে সর্বোচ্চ কয়েক লাখ টাকার বেশি আয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সে ক্ষেত্রে বছরে ৫৭ কোটি টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় পুরোপুরি রাজউকের জন্য গচ্চা হিসেবেই থেকে যাবে।
চুক্তিতে ভবন নির্মাণেও অসততার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক ভবনের ছয়তলার মধ্যে প্রথম তিনতলা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে হলেও ওপরের তিনতলার ব্যয় আলাদাভাবে রাজউক বহন করবে—যা মূল প্রকল্প ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত নয়।
প্রকল্প পরিচালক ও রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদিউল আলম কালবেলাকে বলেন, এখন পর্যন্ত রাজউক মাত্র ৬০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে এবং ৫৪০টি বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছে—যদিও নথি ও মাঠপর্যায়ে এর প্রমাণ মেলেনি। কাজ শেষ হওয়ার আগেই কেন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হচ্ছে—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, বরাদ্দ থাকলে খরচ করতে হয়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডেলকটের এমডি দায়েম খন্দকার বলেন, প্রকল্পের কাজ এখনো চলমান। অগ্রগতির বিষয়ে তিনি রাজউকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন এবং নিজে দেশের বাইরে আছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং সচিব মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
Tags: RAJUK, United Delcot, Purbachal New Town, রাজউক, ইউনাইটেড ডেলকট, পূর্বাচল নতুন শহর
