ভোটের হাওয়া বদলাতে খুলনার ছয় আসনে মুখোমুখি বিএনপি ও জামায়াত, জমজমাট প্রচারে নতুন সমীকরণ


আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খুলনার রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। মাঠপর্যায়ের জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—সব কটি আসনেই মূল লড়াই হবে বিএনপির প্রার্থীদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের। সাবেক তিনজন সংসদ সদস্য ছাড়া এবারের নির্বাচনে অধিকাংশ মুখই নতুন, ফলে ভোটের সমীকরণে যোগ হয়েছে অনিশ্চয়তা ও কৌতূহল।

ফ্যাসিবাদী শাসনামলের তিনটি সংসদ নির্বাচন ছিল কার্যত প্রহসনের নামান্তর। জনগণের ভোটাধিকার হরণ হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলো প্রকৃত অর্থে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সুযোগ পায়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের হামলা, মামলা ও নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভার কাটিয়ে এবার মুক্ত পরিবেশে নিজেদের শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণে ভোটারদের দোরগোড়ায় ছুটছেন প্রার্থীরা। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিরন্তর দৌড়ঝাঁপ, গণসংযোগ ও প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।

তফসিল ঘোষণা, মনোনয়ন সংগ্রহ ও জমা, প্রত্যাহার এবং প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হলেও প্রথম দিকে তেমন নির্বাচনি আমেজ দেখা যায়নি। তবে ভোটের দুই সপ্তাহ আগে থেকে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। এখন খুলনার রাজনীতি পুরোমাত্রায় প্রচার-প্রচারণায় সরগরম।

গত মঙ্গলবার জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান খুলনায় নির্বাচনি জনসভা করে জেলার ছয়টি আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। অন্যদিকে আজ সোমবার খুলনায় নির্বাচনি জনসভায় আসছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ২২ বছর পর তার খুলনা সফর ঘিরে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

আগের সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে মিশ্র চিত্র ফুটে ওঠে। যদিও গত তিনটি নির্বাচনকে অনেকেই গণনায় আনতে চান না, তবুও খুলনায় আওয়ামী লীগের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। মহানগরের দুটি আসনে একাধিকবার বিএনপি জয় পেলেও অন্য চারটি আসনে বেশিরভাগ সময় জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। হিন্দু অধ্যুষিত আসনগুলোতে প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভোটারদের কাছে। পাশাপাশি দুটি আসনে জামায়াতের জয়ের অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

এবার আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং হিন্দু ভোটারদের সমর্থনের বিষয়টি মাথায় রেখে কৌশল সাজিয়েছে দলগুলো। আসন দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে থাকতে জামায়াত সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রার্থীদের হাতে তুলে দিয়েছে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক। অপরদিকে বিএনপি হিন্দু সম্প্রদায়ের জানমালের নিরাপত্তা ও পাশে থাকার অঙ্গীকার তুলে ধরে তাদের আস্থা অর্জনে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।

চলতি নির্বাচনে সারা দেশে আলোচিত আসন খুলনা-১। হিন্দু ভোটার অধ্যুষিত এই আসনে অতীতে তিনবার নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন আমির এজাজ খান। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে এবার তিনি জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদী। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানুষ তার পক্ষেই রায় দেবে বলে তিনি জানিয়েছেন। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী সনাতন শাখার নেতা ও ব্যবসায়ী কৃষ্ণ নন্দী। রাজনীতিতে নবীন হলেও প্রচারে চমক দেখিয়ে এগিয়ে রয়েছেন তিনি। মোট ভোটার ৩ লাখ চার হাজার।

সদর ও সোনাডাঙ্গা থানার ১৬টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত খুলনা-২ আসনকে জেলার প্রেস্টিজিয়াস আসন হিসেবে দেখা হয়। ফ্যাসিবাদী শাসনামল ছাড়া অন্য সময় এই আসন বিএনপির দখলেই ছিল। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের পাতানো ভোটের মধ্যেও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু। দীর্ঘদিন দলীয় পদে না থাকলেও ব্যক্তি ইমেজ ও আন্তরিক ব্যবহারের কারণে তিনি গণমানুষের আপনজন হিসেবে পরিচিত। গণসংযোগে তার প্রতি জনসমর্থন দৃশ্যমান। জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলালও সংগঠিত প্রচার ও অনলাইন তৎপরতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। এ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩১ হাজার ১৫৫।

খুলনা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল। ২০১৮ সালের পরাজয়ের পরও নিয়মিত মানুষের পাশে থাকায় তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বিশেষ করে করোনা সময়ে তার ভূমিকা ভোটারদের মনে রেখাপাত করেছে। জামায়াতের প্রার্থী মহানগর আমির মাহফুজুর রহমান দীর্ঘদিনের প্রচার ও চাঁদাবাজি-মাদকবিরোধী অবস্থানের কারণে আস্থার জায়গা তৈরি করেছেন। এখানে মোট ভোটার ২ লাখ ৪৯ হাজার।

খুলনা-৪ আসনে বিএনপির আজিজুল বারী হেলালের সঙ্গে জামায়াত সমর্থিত ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা সাখাওয়াত হোসেনের লড়াই জমে উঠেছে। অতীত অভিজ্ঞতা ও এলাকার মানুষের পাশে থাকার কারণে হেলাল সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াত দলীয় প্রার্থী প্রত্যাহার করে সাখাওয়াত হোসেনকে সমর্থন দেওয়ায় জোটের প্রচার শক্তিশালী হয়েছে। ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৩ হাজার।

খুলনা-৫ আসনে দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর লড়াই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ২০০১ সালে এখান থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। হিন্দু অধ্যুষিত এই আসনে সব সম্প্রদায়ের মধ্যেই তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। অপরদিকে বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি আলি আসগার লবি। শুরুতে মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও পরে দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এখানে ভোটার সংখ্যা প্রায় চার লাখ।

উপকূলীয় কয়রা ও পাইকগাছা নিয়ে গঠিত খুলনা-৬ আসনে জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ ও বিএনপির মনিরুল হাসান বাপ্পীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে। অতীতে জামায়াত দুবার এখানে জয় পেয়েছে, সাংগঠনিক শক্তিও তাদের পক্ষে। বিএনপি প্রার্থী শুরুতে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সভা-সমাবেশে জনসমাগম বাড়ছে। এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৯ হাজার।

Tags: BNP, Jamaat-e-Islami, Bangladesh Nationalist Party, Jamaat-e-Islami Bangladesh, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী