ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছিল। ভোটের মাঠে প্রচার, জোট–সমীকরণ, বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যে যখন রাজনীতির পারদ ক্রমেই চড়ছিল, ঠিক সেই সময় নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া একটি পোস্ট। নারীদের, বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে করা ওই মন্তব্যকে ‘অবমাননাকর’ ও ‘আপত্তিকর’ বলে অভিযোগ তুলে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা, ক্ষোভ–বিক্ষোভ এবং পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক কর্মসূচি।
গত শনিবার বিকেলে দেওয়া ওই পোস্টে আধুনিকতার নামে নারীদের ঘরের বাইরে নিয়ে আসার প্রসঙ্গে শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়। একই ধারাবাহিকতায় কর্মজীবী নারীদের নিয়ে কটূক্তিমূলক মন্তব্য যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এসব ভাষা নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত অবদানকে খাটো করে দেখানোর শামিল—এমন দাবিতে আপত্তি আরও তীব্র হয়।
পোস্টটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। নারী অধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এমন মন্তব্যকে নারীর মর্যাদা, সামাজিক অবস্থান এবং কর্মক্ষেত্রে ভূমিকার প্রতি চরম অশ্রদ্ধা হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানায়। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল ও ঝাড়ু মিছিলের মতো প্রতীকী কর্মসূচিও পালিত হয়। নারীদের কয়েকটি সংগঠন প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানায়। তাদের মতে, এ ধরনের মন্তব্য কর্মজীবী নারীদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে উসকে দেয় এবং নারীর অগ্রযাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নির্বাচনী প্রচারেও বিষয়টি দ্রুত স্থান করে নেয়। বিভিন্ন দলের নেতারা সভা–সমাবেশে এ প্রসঙ্গ তুলে সমালোচনা করেন। পাল্টা জবাব দিয়েছেন জামায়াত আমিরও, যা বিতর্ককে আরও উসকে দেয়।
তবে অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির দাবি, সংশ্লিষ্ট এক্স অ্যাকাউন্টটি সাইবার হামলার শিকার হয়েছিল এবং বিতর্কিত পোস্টটি দলের নীতিগত অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না। এ ঘটনায় দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয় এবং থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটগ্রহণের সময় যত ঘনিয়ে আসে, রাজনৈতিক বক্তব্য তত বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি মন্তব্যও তখন বড় ধরনের জনমত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এ ধরনের ইস্যু দ্রুত রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায় এবং নির্বাচনী পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান বলেন, নির্বাচনের সময় সামাজিকমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্য আর নিছক ব্যক্তিগত মত হিসেবে থাকে না; সেগুলো রাজনৈতিক বার্তা ও অবস্থান হিসেবেই বিবেচিত হয়। বিশেষ করে নারীদের মতো বৃহৎ সামাজিক গোষ্ঠীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য সমাজে বিভাজন বাড়ায় এবং এর প্রভাব সরাসরি ভোটের রাজনীতিতে পড়ে।
এই বিতর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যশোরের এক নির্বাচনী জনসভায় বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নারীদের কর্মসংস্থান নিয়ে কলঙ্কজনক মন্তব্য করেছেন। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী সমাজকে যারা অসম্মান করে এবং কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালি দেয়, তারা দেশদরদি বা জনদরদি হতে পারে না।
আইডি হ্যাক হওয়ার দাবিকে মিথ্যাচার আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তীব্র সমালোচনার মুখে এখন বলা হচ্ছে—আইডি হ্যাক হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অসম্ভব। নির্বাচনের আগে জনগণের সামনে এভাবে মিথ্যা বলা দেশের জন্য অশনিসংকেত। যারা অবলীলায় মিথ্যা বলে, তারা কখনোই দেশের মঙ্গল করতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালেই প্রমাণ হয়েছে মা–বোনদের জন্য এদের কোনো দরদ নেই; সে সময় তাদের ভূমিকার কারণে লাখ লাখ মা–বোন ইজ্জত হারিয়েছেন।
নারী ইস্যুতে এমন বক্তব্যের প্রতিবাদে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, নারীর প্রতি নি’\র্যা’\তন আজ ভীতিকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে নারীদের নিয়ে অবমাননাকর ও অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য ক্রমেই বাড়ছে। ’৭১–এর বিরোধী শক্তি আবারও সক্রিয় হয়ে নারীর অর্জন মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। তারা নারীর অধিকার, মর্যাদা ও রাজনৈতিক–অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে লাগাতার অসাংবিধানিক বক্তব্য দিচ্ছে।
ক্যাম্পাসেও প্রতিবাদ: ঢাকায় ও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝাড়ু মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানায়। বক্তারা জামায়াত আমিরের প্রকাশ্য ক্ষমা দাবি করেন এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন।
একই সময়ে শিবির ও ছাত্রী সংস্থার পক্ষ থেকেও পাল্টা কর্মসূচি পালিত হয়। শিবিরের নেতারা দাবি করেন, একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহল পরিকল্পিতভাবে সাইবার আক্রমণ চালিয়ে এই বিতর্ক তৈরি করেছে।
হ্যাকের ব্যাখ্যা দিতে জামায়াতে ইসলামী সংবাদ সম্মেলন করে। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, পোস্টটি পরিকল্পিত সাইবার হ্যাকিংয়ের ফল। পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, ই–মেইল নোটিফিকেশন ও অ্যাকাউন্ট রিকভারি–সংক্রান্ত তথ্য সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা হয়। তাদের দাবি, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ধরন অনুযায়ী উদ্ধারের সময় ভিন্ন হতে পারে। কখনো মিনিটেই সমাধান সম্ভব, আবার জটিল ক্ষেত্রে দিন বা সপ্তাহও লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে নারীদের নিয়ে করা একটি মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মাঠে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দেশের রাজনীতিকে আরও সংবেদনশীল ও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
