সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে তৎপরতা তুঙ্গে: বিএনপি জোটের ঝুলিতে থাকতে পারে ৩৭টি আসন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে সরকার গঠনের পর সংরক্ষিত নারী আসনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে গতি এসেছে। দলীয় সূত্র বলছে, সাধারণ আসনে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে ৩৭টিই যেতে পারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)-নেতৃত্বাধীন জোটের দখলে। নির্বাচন কমিশনও রমজান মাসের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন (Election Commission) সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগেই সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায় কমিশন। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত আসনের নির্বাচন শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই সময়সীমার ভেতরেই সব প্রক্রিয়া সম্পন্নের প্রস্তুতি চলছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে। আরও দুটি আসনে তাদের প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন। পাশাপাশি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত সাতজনই মূলত দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী হওয়া বিএনপি নেতা। এই হিসাব ধরেই সংরক্ষিত নারী আসনে দলটির ভাগে ৩৭টি আসন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

দলটির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পরই সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। যোগ্যতা, দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ, দলে অবদান এবং সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা—এসব মানদণ্ড বিবেচনায় চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রবীণ ও নবীনদের সমন্বয়ে যেভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল, এখানেও সেই নীতিই অনুসরণ করা হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (Iqbal Hasan Mahmud Tuku) বলেন, ‘নেত্রীদের রাজনৈতিক ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও অবদান বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আগের মতোই প্রবীণ-নবীনের সমন্বয় রাখা হবে।’ তার বক্তব্যে স্পষ্ট—সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দলীয় ভারসাম্য রক্ষারও এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

৩৭টি আসনের বিপরীতে আগ্রহী নেত্রীর সংখ্যা ইতোমধ্যে শতাধিক ছাড়িয়েছে। বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের অনেকেই ঢাকায় অবস্থান করে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। মনোনয়নবঞ্চিত বা সাম্প্রতিক নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের নেত্রীরাও আলোচনায় উঠে এসেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত যাবে দলের হাইকমান্ডের টেবিলে।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী বেগম সেলিমা রহমান (Begum Selima Rahman) এবং মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস (Afroza Abbas)। বরিশালে মনোনয়ন না পাওয়া সেলিমা রহমান এবং ঢাকা-৯ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী আফরোজা আব্বাস—দুজনই সংরক্ষিত নারী আসনে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে দলীয় মহলে আলোচনা চলছে।

তাদের বাইরে আলোচিত নামের তালিকাও দীর্ঘ। স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী এবং ‘অর্পণ আলোক সংঘ’-এর মাধ্যমে নির্যাতিত কর্মীদের পাশে থাকা বীথিকা বিনতে হুসাইন রয়েছেন সম্ভাব্যদের কাতারে। মহিলা দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী এবং গুম হওয়া নেতাদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলিও আলোচনায় এগিয়ে আছেন।

এছাড়া কেন্দ্রীয় নেত্রী শিরিন সুলতানা, সুলতানা আহমেদ, নাজমুন নাহার বেবী, সাবেক এমপি শাম্মী আকতার, নিলোফার চৌধুরী মনি, আসিফা আশরাফী পাপিয়া, রাশেদা বেগম হীরা, রেহেনা আকতার রানু, ইয়াসমিন আরা হক, জাহান পান্না, বিলকিস ইসলাম ও ফরিদা ইয়াসমিনের নামও সম্ভাব্য তালিকায় ঘুরছে। পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকেও কয়েকজনের নাম সামনে এসেছে—কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভীন, কনক চাঁপা এবং সাংবাদিক প্রতিনিধি হিসেবে শাহনাজ পলি আলোচনায় রয়েছেন। স্থায়ী কমিটির প্রয়াত সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের স্ত্রী হাসনা জসীমউদ্দীন মওদুদও সম্ভাব্যদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন।

তরুণ প্রজন্মের নেত্রীদের মধ্যেও রয়েছে জোর প্রতিযোগিতা। শাহানা আকতার সানু, নিয়াজ হালিমা আর্লি, রাবেয়া আলম, জেবা আমিন খান, শাহিনুর নার্গিস, তানজিন চৌধুরী লিলি, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা উর্মি, সেলিনা সুলতানা নিশিতা, শাহিনুর সাগর, ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, আরিফা সুলতানা রুমা, সামিরা তানজিনা চৌধুরী ও সৈয়দা আদিবা হোসেন—এদের অনেকে ইতোমধ্যে দলীয় পর্যায়ে সক্রিয় যোগাযোগ শুরু করেছেন। কেউ কেউ পূর্ববর্তী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন, কেউবা মনোনয়নবঞ্চিত ছিলেন।

সব মিলিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনকে ঘিরে দলে ভেতরে চলছে নীরব প্রতিযোগিতা ও সমীকরণ। শেষ পর্যন্ত দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বেই চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা নির্ধারণ করা হবে—এমনটাই জানিয়েছেন দলীয় দায়িত্বশীল নেতারা। ফলে এখন নজর শুধু সময়সূচির দিকে নয়, বরং কারা পাচ্ছেন সেই কাঙ্ক্ষিত মনোনয়ন—সেদিকেও।