বঙ্গভবনে কাটানো দেড় বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও খোলামেলা সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন (Mohammad Shahabuddin)। ঢাকার দৈনিক কালের কণ্ঠ (Kaler Kantho)-কে দেয়া দীর্ঘ আলাপে তিনি তুলে ধরেছেন নীরব উত্তেজনা, রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং সাংবিধানিক টানাপোড়েনের এক অন্দরকাহিনি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ ছিলেন না। অথচ তার পদ ঘিরে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছিল বলে দাবি করেন তিনি। সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি করে অসাংবিধানিক উপায়ে প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দেয়ার একাধিক পরিকল্পনা হয়েছিল—এমন অভিযোগও করেন তিনি। তবে তিনি ছিলেন সিদ্ধান্তে অবিচল। একের পর এক ছক তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সবই ব্যর্থ হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রেসিডেন্ট বলেন, কঠিন সেই সময়টিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party) বা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিল দৃঢ়ভাবে। সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে তারা স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিল। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique Rahman)-কে নিয়ে তার মনে শুরুতে কৌতূহল থাকলেও পরে তাকে আন্তরিক ও দায়িত্বশীল বলে মনে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন সাহাবুদ্দিন। তার ভাষায়, “দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা ছিল শতভাগ।” একই সঙ্গে সশস্ত্রবাহিনীর পক্ষ থেকেও সর্বোচ্চ সমর্থন পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
অপসারণের উদ্যোগের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট বলেন, মূলত গণঅভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে তাকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। কয়েকটি রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় এবং অন্তর্বর্তী সরকারও তাদের সঙ্গে সুর মিলায়। যদিও বিষয়টি নিয়ে দুইটি গ্রুপে বিভক্তি তৈরি হয়। গ্রুপভিত্তিক বৈঠক, আলোচনা, বিভিন্ন দল ও জোটের সঙ্গে যোগাযোগ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এক পর্যায়ে এমন দাঁড়ায় যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই তাকে অপসারণ করা হবে। মনোবল ভেঙে দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করার কৌশলও ছিল বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
তবে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতারা তাকে বারবার আশ্বস্ত করেছিলেন—সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে এবং প্রেসিডেন্ট অপসারণের পক্ষে তারা নন। জোটের ভেতরেও একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয় বলে দাবি করেন সাহাবুদ্দিন। তার মতে, বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীদের অবস্থানের কারণেই অপসারণ প্রক্রিয়া সফল হয়নি।
সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি কি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন? জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, সেই সংকটময় সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস (Dr. Muhammad Yunus)-এর কাছ থেকে তিনি কোনো ফোন পাননি। কোনো ধরনের যোগাযোগও ছিল না। ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের ব্যাপারেও তিনি বলেন, তারা তার পাশেই ছিলেন এবং চাননি এভাবে তাকে অপসারণ করা হোক।
প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস সংবিধানের বিধান মেনে চলেননি। সংবিধান অনুযায়ী বিদেশ সফর শেষে প্রেসিডেন্টকে লিখিতভাবে সফরের আলোচনা ও চুক্তির বিবরণ জানানোর কথা থাকলেও ১৪-১৫ বার বিদেশ সফরের পরও তিনি তা করেননি বলে দাবি করেন সাহাবুদ্দিন। তার আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে, কিন্তু সেসব বিষয়েও প্রেসিডেন্টকে অবহিত করা হয়নি। অনেক অধ্যাদেশকেই তিনি অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেন।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ড. ইউনূস তার সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কও রাখেননি। একবারের জন্যও বঙ্গভবনে যাননি। বরং তাকে সম্পূর্ণভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তার দুইবারের বিদেশ সফর আটকে দেয়া হয়, প্রেস উইং কার্যত বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি দুজন ফটোগ্রাফারকেও পাওয়া যায়নি। “বলতে পারেন একদম প্রতিবন্ধী করে দেয়া হয়েছিল,”—এভাবেই পরিস্থিতির বর্ণনা দেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি কেবিনেট সেক্রেটারিকে বারবার ফোন করেছেন, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন, জনপ্রশাসন সচিবকেও বলেছেন। কিন্তু তার অভিযোগ, কেউই সাড়া দেননি। সেই অভিজ্ঞতা তার ভাষায় ছিল নীরব অবরোধের মতো—যেখানে পদ আছে, কিন্তু কার্যত ক্ষমতার প্রয়োগে অদৃশ্য এক দেয়াল।
