তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া, গরমে চাহিদা পূরণে ঝুঁকি

বিদ্যুৎ খাতে দেশি ও বিদেশি কোম্পানির কাছে মোট ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে, যার মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বকেয়া ১৪ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত সাত–আট মাস ধরে বিদ্যুতের বিল পাননি।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করীম জানান, এই বকেয়া ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে এ পর্যায়ে এসেছে। সরকারের সাবসিডি এবং পিডিবির আর্থিক সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে বিল পরিশোধ সম্ভব। সাবেক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, রেভিনিউ সংকটের কারণে বিল সময়মতো দেওয়া সম্ভব হয়নি, কোনো ইচ্ছাকৃত বকেয়া রাখা হয়নি।

বাংলাদেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মোট উৎপাদন সক্ষমতার ২৩ শতাংশের মতো। ফার্নেস অয়েলে চালিত কেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় ৫৬৩৭ মেগাওয়াট, যার মধ্যে বেসরকারি কোম্পানির অংশ চার হাজার মেগাওয়াট। বিপপা (বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান) সতর্ক করেছে, বকেয়া দ্রুত পরিশোধ না হলে গরমে চাহিদামত বিদ্যুৎ উৎপাদন কঠিন হবে। এলসি খোলার পর ৪০–৪৫ দিন লাগায়, তেলের মজুদ কমে যাওয়ায় পিক টাইমে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পিডিবি বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে সময়মতো বিদ্যুৎ না দেওয়ার কারণে চুক্তি অনুযায়ী এলডি বা লিকুইডিটি ড্যামেজ ধার্য করেছে, তবে এতে আপত্তি করেছে উৎপাদনকারীরা। পিডিবির চেয়ারম্যান বলেন, “অমিমাংসিত এলডি ইস্যু রয়েছে, পরে চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাবে।”

বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকট এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৮৮ শতাংশ জ্বালানি হিসেবে গ্যাস, কয়লা ও তেল ব্যবহার হয়, যার বড় অংশই আমদানি। দেশীয় গ্যাস কমে যাওয়ায় এলএনজি ও তেল আমদানি জরুরি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন জানান, বিদ্যুতের ভর্তুকি প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন ও ভর্তুকি নির্ধারণ করে দিলে সরকারের আর্থিক চাপ সামলানো সম্ভব। বিদ্যুৎ খাতে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন, যার মধ্যে বিদেশি দাতা সহায়তা ও সরাসরি বিনিয়োগ অপরিহার্য।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম দুর্নীতি ও অনিয়মকে বকেয়ার মূল কারণ হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, “সৎভাবে নির্মিত আইপিপি যথাসময়ে বিল পাবে; অসৎ কেন্দ্রগুলোই সংকট সৃষ্টি করছে।”

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ পদ্ধতিতে কাজ করছে। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো স্ট্যান্ডবাই থাকবে এবং জরুরি অবস্থায় চালু রাখা হবে। গরমে সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে, যা পূরণ করার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।