অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অপরাধের বিভিন্ন সূচক নিম্নমুখী থাকলেও ভঙ্গুর পুলিশি ব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা দুর্বলতা এখন স্পষ্ট। সেই বাস্তবতায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের প্রশ্নে ন্যূনতম ছাড় দিতেও রাজি নয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে একগুচ্ছ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে পুলিশপ্রধান পদে আনা হয়েছে নতুন মুখ; সামনে আরও বড় পরিসরে রদবদলের আভাস মিলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ বাহিনী ও সরকার-ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের মূল ভার বহন করে পুলিশই। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে বাহিনীর সক্ষমতায় ঘাটতি রয়ে গেছে। এ ঘাটতি পূরণে যুগোপযোগী সংস্কার, সুসংহত পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে নির্বাচিত সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে—যে বা যারা অপরাধ করবে, আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে; কোনো ধরনের ছাড় নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman) এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed)-এর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের রূপরেখা স্পষ্ট হয়েছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। সারা দেশে জুয়া ও মাদকের বিস্তারকে আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে এসব নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের কথাও জানান তিনি। জনজীবনে স্থিতি ফেরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ তৎপর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই দিনে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলেন, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। গত কয়েকদিনে তার বিভিন্ন কর্মসূচিতে পুলিশবাহিনীকে ঘিরে পরিকল্পনার ইঙ্গিত মিলেছে। তিনি স্পষ্ট করেছেন—পুলিশের আইনানুগ কাজে কেউ অবৈধভাবে বাধা দিতে পারবে না, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও সহ্য করা হবে না। পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে বাহিনীকে চেইন অব কমান্ড মেনে চলার নির্দেশ দেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রী ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের অধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, জনগণের আস্থা অর্জনের মধ্য দিয়েই পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীকে দ্রুত জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। একই সঙ্গে যুগোপযোগী উন্নয়নে সুসংহত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর-সংস্থাগুলোকে পরামর্শ ও সুপারিশমালা তৈরির নির্দেশ দেন।
সরকার-ঘনিষ্ঠ সূত্রের ভাষ্য, মাঠপর্যায় থেকে শীর্ষপর্যায় পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসনে পরিবর্তনের পরিকল্পনা এগোচ্ছে। আইজিপি নিয়োগের মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরু হলেও ধাপে ধাপে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও বদলি ও নিয়োগ হবে। পুলিশবাহিনীর শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে; কনস্টেবল পদে বড় নিয়োগ আসছে শিগগিরই। এ ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের বদলে যোগ্যতা ও পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলছে সরকার।
আইজিপি পদে পুলিশ ক্যাডারের ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা আলী হোসেন ফকিরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি এপিবিএনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন। পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগর পুলিশ (Dhaka Metropolitan Police), রেঞ্জ ডিআইজি, র্যাব, সিআইডিসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে অন্তত ৩০টি জেলায় পুলিশ সুপার পদেও রদবদলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানায়, জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জেলা ও থানায় ‘লটারির’ মাধ্যমে এসপি ও ওসি পদায়ন করেছিল। বর্তমান সরকারের মতে, এসব পদায়ন সার্ভিস রেকর্ড বিবেচনায় হওয়া উচিত ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক বৈঠকে বলেন, ‘লটারির মাধ্যমে পদায়নে যার যেখানে যাওয়ার কথা নয়, সেখানেও দেওয়া হয়েছে। প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আমরা দক্ষতা ও উপযুক্ততা বিবেচনায় নিয়ে এগোব।’
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দায়িত্ব নিয়েই প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মবের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। নিয়মিত অপরাধের পাশাপাশি মব-সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা, জুয়া, মাদক, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ ঠেকাতে সব ইউনিট প্রধান, মেট্রোপলিটন কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কেউ চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে জড়ালে দল-মত নির্বিশেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। যাতে কোনো ধরনের বিতর্ক না তৈরি হয়, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। যদিও এরই মধ্যে কেউ কেউ আগের সময়ে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলে কিংবা দলীয় পরিচয় সামনে এনে ভালো পদায়নের জন্য তদবিরের চেষ্টা করছেন। তবে মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী যোগ্যতার তালিকা ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার ভেতরে নিজেদের পরিচালিত করতে পারেনি। অপরাধী বা মবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে উল্টো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণ করা এখন জরুরি।’ তার মতে, পুলিশের প্রতি সরকারের স্পষ্ট নিশ্চয়তা থাকা দরকার—অপরাধ করলে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেখানে কোনো হস্তক্ষেপ হবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশে থেকে যারা রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়, তারাই বাহিনীকে বিতর্কিত করে। পুলিশ সদস্যরা যেন রাজনৈতিক পরিচয় তৈরির সুযোগ না পান, সেদিকে সরকারের নজর রাখতে হবে।’
