বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়ে পাঁচ প্রশ্ন, ডা. তাসনিম জারার বিশ্লেষণে উঠল নীতিগত উদ্বেগ

বাংলাদেশ ব্যাংকে নতুন গভর্নর নিয়োগকে ঘিরে অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণী মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। এ নিয়োগের ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা।

বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি শুধু প্রশ্নই তোলেননি, বরং গভর্নরের সাংবিধানিক ও নীতিগত ভূমিকা নিয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

পোস্টের শুরুতে জারা লেখেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের ভূমিকা মৌলিকভাবে আলাদা। সচিব সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করেন। সরকার বদলালে তাই সিনিয়র সচিব বদলানো অস্বাভাবিক নয়।’

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গভর্নরের কাজ কেবল প্রশাসনিক নয়; বরং তা অর্থনীতির গভীর ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত। ‘গভর্নরের কাজ মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রয়োজনে সরকারকেও ‘না’ বলা। যখন সরকার অতিরিক্ত ব্যয়ের পথে যায়, যখন রাজনৈতিক চাপে মুদ্রা ছাপানোর তাগিদ আসে, তখন গভর্নরকে দাঁড়াতে হতে পারে সরকারের বিপরীতে। আর এই কারণেই বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতাকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়,’—লেখেন তিনি।

তরুণ এই চিকিৎসক আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ার চার বছরের জন্য নিয়োগ পান এবং রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সেই মেয়াদ সাধারণত অক্ষুণ্ণ থাকে। তার ভাষ্য, গভর্নরের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকার উদ্দেশ্যই হলো তাকে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রাখা। ফলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গভর্নর বদলানো সচিবালয়ের রদবদলের মতো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার বিষয়।

এরপর তিনি সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ টেনে লেখেন, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে সরিয়ে একজন সক্রিয় ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দিয়েছে। তার মতে, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটেই তিনি পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন সামনে আনেন।

প্রথমত, গভর্নর কি সরকারের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলে তা প্রকাশ করতে পারছেন, নাকি প্রতিটি সিদ্ধান্তই সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়ে আসছে?

দ্বিতীয়ত, নতুন গভর্নর কি তার সব ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা বাস্তবিক অর্থে ত্যাগ করেছেন, নাকি নিয়োগপত্রের শর্ত কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের সমস্যা—খেলাপি ঋণ—সমাধানে তিনি কি কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছেন?

চতুর্থত, সুদের হার, মুদ্রা সরবরাহ ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে, নাকি হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে? আর যদি পরিবর্তন আসে, তাহলে তা কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে?

পঞ্চমত, টাকার মান কি বাজারভিত্তিকভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, নাকি অতীতের মতো কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটা হচ্ছে?

উল্লেখ্য, বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)-এর গভর্নরের পদ থেকে আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে ব্যবসায়ী নেতা মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে চলছে বিস্তর আলোচনা।

ডা. তাসনিম জারার উত্থাপিত প্রশ্নগুলো এখন মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে জনপরিসরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।