ভাষা আন্দোলনের চেতনায় শুরু অমর একুশে বইমেলা ২০২৬, ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে বইয়ের মহোৎসব

ভাষা আন্দোলনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজ শুরু হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ মেলা চলবে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত। বাংলা একাডেমি (Bangla Academy) প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান (Suhrawardy Udyan)জুড়ে এরই মধ্যে শেষ হয়েছে সার্বিক প্রস্তুতি। বইপ্রেমীদের পদচারণায় মুখরিত হওয়ার অপেক্ষায় এখন পুরো প্রাঙ্গণ।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মেলার উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)। একই অনুষ্ঠানে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ প্রদান করবেন।

স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।

উদ্বোধনের আগের দিন পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গণে ছিল কর্মচাঞ্চল্য। বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা নতুন বইয়ের কার্টন খুলে তাক সাজাতে ব্যস্ত ছিলেন। কোথাও স্টলের নামফলক স্থাপন, কোথাও আলোকসজ্জা পরীক্ষা, আবার কোথাও শেষ মুহূর্তের রং ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলেছে রাত পর্যন্ত। নতুন বইয়ের গন্ধ আর ব্যস্ততার শব্দ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনন্য আবহ।

মেলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ধুলা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পানি ছিটানো এবং মশকনিধনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রবেশ পথে আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টর বসানো হয়েছে। প্রায় ৩০০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে মনিটরিং ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে ৮৭টি লিটলম্যাগ স্টল সাজিয়েছে। শিশু চত্বরে শিশুতোষ বই নিয়ে অংশ নিচ্ছে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান, ইউনিট ১০৭টি। সব মিলিয়ে এবারের মেলায় অংশগ্রহণ করছে ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। মোট ইউনিট ১ হাজার ১৮টি—সংখ্যায় ও আয়োজনে যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় আয়োজন।

ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে প্রবেশ বন্ধ থাকবে। ছুটির দিনে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে মেলা, যাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারেন।

মেট্রোরেল স্টেশনের অবস্থান বিবেচনায় গতবারের বাহির পথ কিছুটা সরিয়ে মন্দির গেটের কাছে নেওয়া হয়েছে। টিএসসি, দোয়েল চত্বর, এমআরটি বেসিং প্লান্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন অংশে চারটি প্রবেশ ও বাহির পথ রাখা হয়েছে। খাবারের স্টলগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সীমানা ঘেঁষে বিন্যস্ত করা হয়েছে, যাতে মূল বইমেলা এলাকা স্বস্তিদায়ক থাকে।

এবারের আয়োজন ‘জিরো ওয়েস্ট বইমেলা’ হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে। রমজান উপলক্ষে মুসল্লিদের জন্য তারাবির নামাজের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশ (Dhaka Metropolitan Police)-এর কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, বইমেলা ঘিরে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ আশপাশের এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় থাকবে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন থাকবে। সোয়াট, বোম ডিসপোজাল ইউনিট, সিটিটিসি ও ডিবি পুলিশ প্রস্তুত থাকবে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায়।

মব সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বলেন, এমন কোনো আশঙ্কা নেই। তারপরও পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থাকবে। ধর্ম অবমাননাকর বা উসকানিমূলক কোনো বই যাতে মেলায় না আসে, সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে একটি পুলিশ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে, যেখান থেকে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং চলবে। প্রতিটি গেটে আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশি করা হবে। নিয়মিত ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে। নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে—লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সেন্টার, ব্রেস্টফিডিং কর্নার ও শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র। অসুস্থদের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা থাকবে।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, বইমেলা চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিশেষ ডাইভারশন পরিকল্পনা কার্যকর থাকবে। ভারী যানবাহন প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকবে এবং অনুমোদিত স্থান ছাড়া কোথাও গাড়ি পার্ক করা যাবে না।