চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে ২৬ বছরের ঐতিহ্যবাহী গণইফতার

মাগরিবের আজান ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে প্রাণ ফেরে দোয়া ও ইফতারের শব্দে। প্রতিদিন অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ একসঙ্গে ইফতার করেন, যেখানে ধনী-গরিব, পেশা বা বয়সের কোনো ভেদাভেদ থাকে না। ছাত্র, ব্যবসায়ী, দিনমজুর, পথচারী—সবাই এক কাতারে বসে খেজুর হাতে তুলে নেন ইফতার।

চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানাধীন এই মসজিদটি মোগল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। ১৬৬৭ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে তৎকালীন সুবাদার শায়েস্তা খাঁ এটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে মসজিদটি পরিচালনার দায়িত্ব ইসলামিক ফাউন্ডেশনের।

১৯৯৬ সালে খতিব হিসেবে দায়িত্ব নেন সৌদি নাগরিক মাওলানা সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী আল মাদানি। তার উদ্যোগে ২০০১ সালে সৌদি আরবের আদলে এখানে প্রথম গণইফতার শুরু হয়। পর থেকে ২৬ বছর ধরে চলমান এই ঐতিহ্য রমজান এলেই নাগরিকদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ। রমজানের প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এখানে ইফতার করেন, বিশেষ করে ২০ রমজানের পর সংখ্যাটি আরও বৃদ্ধি পায়।

রমজান এলেই আন্দরকিল্লা সড়ক মহাকায় এক প্রস্তুতির অংশ হয়ে ওঠে। বস্তায় বস্তায় ছোলা, মুড়ি, খেজুর, তেল, মসলা, শরবতের উপকরণ ও ফলমূল রিকশা-ভ্যানে করে মসজিদে পৌঁছে যায়। শ্রমিকরা মালামাল গুদামে তুলছেন, বাবুর্চিরা রান্নায় ব্যস্ত। বিকাল গড়াতেই থালায় থালায় সাজানো হয় ১২ থেকে ১৪ পদের ইফতার। মাগরিবের আজান ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ একসঙ্গে ইফতার করেন।

মসজিদের মুসল্লি পরিষদ জানিয়েছে, রমজানের প্রথম দিন থেকেই ইফতারের আয়োজন করা হয়। খাদেমসহ ২০ জনের বেশি স্বেচ্ছাসেবক বিকাল পর্যন্ত প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকেন। ১০-১২ জন বাবুর্চি ভোর থেকেই রান্নায় কাজ করেন। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার লিটার শরবত প্রস্তুত করা হয়। গরমে লেবু-চিনির শরবত, ঠান্ডায় রুহ আফজা পরিবেশন করা হয়।

মসজিদের খতিবের সহকারী হাসান মুরাদ জানান, আন্দরকিল্লা ও খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা রিকশা ও ভ্যানে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠান। কেউ খেজুর দেন, কেউ ছোলা, কেউ পেঁয়াজ, রসুন, তেল বা মুড়ি। অনেকে বাড়িতে তৈরি হালিম, জিলাপি, পায়েসও পাঠান। মসজিদের দুটি গুদামে অন্তত ১০ দিনের ইফতারের বাজার সবসময় মজুত থাকে।

আসরের নামাজের পর মুসল্লিরা মসজিদে আসতে শুরু করেন। কেউ কোরআন তেলাওয়াত করেন, কেউ নফল ইবাদতে মগ্ন থাকেন। প্রতিদিন কোরআনের বিভিন্ন সূরা থেকে বয়ান ও মাসয়ালা নিয়ে আলোচনা হয়। ইফতারের পর পুরো জায়গাটি পরিষ্কার করে মাগরিবের নামাজ আদায় করা হয়।

শিক্ষার্থী রাহাতুল ইসলাম বলেন, এখানে বয়ানের মাধ্যমে কোরআনের আলোকে জীবন পরিচালনার শিক্ষা পাওয়া যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ী এমরান হোসেন জানালেন, গত আট বছর ধরে নিয়মিত এখানে ইফতার করছেন। মুসল্লি আবু সাহেদ জানিয়েছেন, ছাত্র, শিক্ষক, দিনমজুর থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী—সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এক কাতারে বসে ইফতার করেন। আশপাশের হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও ইফতারে অংশ নেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই গণইফতার চট্টগ্রামের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে, যা ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ।