জাকাতের হকদার কারা, কাদের দেওয়া যাবে না—কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত নির্দেশনা

পবিত্র কুরআনে আট শ্রেণির মানুষকে জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হিসেবে নির্ধারণ করে আল্লাহতাআলা ঘোষণা করেছেন—“নিশ্চয় সদকা হচ্ছে দরিদ্র ও অভাবীদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য; তা বণ্টন করা যায় দাস আজাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।” (সুরা তওবা: ৬০)

এই আয়াতের ভিত্তিতে জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত আট শ্রেণির মানুষ হলেন—

  1. ফকির—যার কিছুই নেই।
  2. মিসকিন—যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই।
  3. জাকাত আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারী।
  4. আর্থিক সংকটে থাকা নওমুসলিম।
  5. ক্রীতদাস—মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে।
  6. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি।
  7. আল্লাহর পথে জি’\হাদে রত ব্যক্তি।
  8. মুসাফির—নিজ দেশে ধনী হলেও ভ্রমণকালে অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন এবং দেশ থেকে অর্থ এনে প্রয়োজন পূরণের উপায় নেই।

আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ যদি এই শ্রেণিগুলোর অন্তর্ভুক্ত হন, তাহলে আত্মীয়তার স্তর অনুযায়ী অনেককে জাকাত দেওয়া যায়, আবার কিছু আত্মীয়কে জাকাত দেওয়া বৈধ নয়।

যাদের জাকাত দেওয়া যায় না

তিন ধরনের আত্মীয়কে জাকাত দেওয়া যায় না—

  1. জাকাতদাতার সরাসরি উর্ধ্বতন আত্মীয়—যেমন বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, পরদাদা-পরদাদি, পরনানা-পরনানিসহ সরাসরি ওপরের দিকে যারা আছেন।

  2. জাকাতদাতার সরাসরি সন্তান বা বংশধর—যেমন পুত্র-কন্যা, পৌত্র-পৌত্রী, দৌহিত্র-দৌহিত্রী—এভাবে নিচের দিকে যাদের বংশধারা।

  3. স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে জাকাত দিতে পারেন না।

এই তিন শ্রেণির কেউ অভাবগ্রস্ত হলে তাদের সাধারণ সম্পদ থেকে যথাসাধ্য সাহায্য করা কর্তব্য। তাই তাদের জাকাত দেওয়া বৈধ নয়।

তবে অন্যান্য আত্মীয়—যেমন ভাই-বোন, খালা-খালু, ফুফু-ফুফা, মামা-মামি, চাচা-চাচি, শ্বশুর-শাশুড়ি—যদি জাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হন, তাহলে তাদের জাকাত দেওয়া যাবে। আত্মীয়দের মধ্যে কেউ অভাবী থাকলে তাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম। এতে একই সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও জাকাত আদায়ের সওয়াব অর্জিত হয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন, সাধারণ অভাবীদের সদকা করলে তা শুধু সদকা হয়, আর আত্মীয়দের দিলে তা সদকা হওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়তার হক আদায়ও হয়। (মুসনাদে আহমাদ: ১৫৭৯৪, সুনানে নাসাঈ: ২৫৮২)

জাকাত ইসলামের ফরজ বিধান এবং ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। প্রত্যেক স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক ও সম্পদশালী মুসলমান নারী-পুরুষের ওপর প্রতি বছর নিজের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্র-দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণ করা ফরজ।

জাকাতের হিসাব যেভাবে করবেন

কেউ যদি এক বছর ধরে নেসাব পরিমাণ বর্ধনশীল সম্পদের মালিক থাকেন—অর্থাৎ ৭ তোলা বা ৮৭.৪৫ গ্রাম বা তার বেশি স্বর্ণ, অথবা সাড়ে ৫২ তোলা বা ৬১২.৩৫ গ্রাম রৌপ্য, কিংবা ৮৭.৪৫ গ্রাম স্বর্ণের মূল্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ—তাহলে তিনি ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদশালী হিসেবে গণ্য হবেন এবং তার ওপর জাকাত ওয়াজিব হবে।

নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য বা ব্যবসায়িক সম্পদ যেদিন নেসাব পর্যায়ে পৌঁছাবে, সেদিন থেকেই জাকাতের বর্ষ গণনা শুরু হবে। বর্ষ পূর্ণ হওয়ার দিনে মালিকানায় যে পরিমাণ বর্ধনশীল সম্পদ থাকবে—নগদ অর্থ, ব্যবসার মাল, স্বর্ণ বা রৌপ্য—তার ৪০ ভাগের ১ ভাগ, অর্থাৎ ২.৫ শতাংশ জাকাত হিসেবে প্রদান করতে হবে।

হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বছরে একবার জাকাতের হিসাব করতে হয়। আমাদের দেশে অনেকে রমজান মাসে জাকাত হিসাব করে থাকেন। হিসাব সম্পন্ন হওয়ার পর পুরো অর্থ একসঙ্গে আদায় করা বাধ্যতামূলক নয়; বরং সারা বছর ধাপে ধাপে তা পরিশোধ করা যেতে পারে।