ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হা’\মলায় নি’\হত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ‘ফারস নিউজ এজেন্সি (Fars News Agency)’ খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে দেওয়া এক ঘোষণায় উপস্থাপক পুরো দেশে ৪০ দিনের শোক পালনের ঘোষণা দেন—যেন এক মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে ইরানের আকাশ।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ভোরে তেহরানে নিজ দপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হা’\মলায় তিনি নি’\হত হন। সরকারি বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘কাপুরুষোচিত হা’\মলা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি না নির্বাচনে অংশ নিতেন, না জাতিসংঘে নিয়মিত ভাষণ দিতেন—তবুও তার একটি সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলকে কাঁপিয়ে দিতে পারত। তিনি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (Ayatollah Ali Khamenei), ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা—যাকে বলা হয় ‘সুপ্রিম লিডার অব ইরান’।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান (Iran)-এর শাসনপদ্ধতি অন্য অনেক দেশের তুলনায় আলাদা। জনগণের ভোটে প্রেসিডেন্ট বা সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হলেও রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই ক্ষমতার শীর্ষে ছিলেন আয়াতুল্লাহ আলী হোসেইনি খামেনি—ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাবের এক অনন্য সংমিশ্রণ।
কে এই আয়াতুল্লাহ আলী?
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় বিশেষজ্ঞের পরিবারে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি শৈশব থেকেই ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে ওঠেন। নিজ শহরের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা শেষে তিনি যান শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমে। সেখানেই তার ধর্মীয় চিন্তা ও রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তি আরও দৃঢ় হয়।
১৯৬২ সালে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরোধিতাকারী আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন। আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তাকে একাধিকবার গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল। দমন-পীড়ন তার অবস্থান বদলাতে পারেনি; বরং তাকে আরও দৃঢ় করেছে।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর আলী খামেনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ‘ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (Islamic Revolutionary Guard Corps)’ সংগঠিত করতে সহায়তা করেন। সময়ের সঙ্গে এই বিপ্লবী গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৯৮১ সালে এক বো’\মা হা’\মলায় তিনি গুরুতর আহত হন। ওই হা’\মলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল দেশটির বামপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। সেই বো’\মা হা’\মলার পর খামেনি তার ডান হাতের কার্যক্ষমতা সারা জীবনের জন্য হারিয়ে ফেলেন। ঘটনার মাত্র দুই মাস পর একই গোষ্ঠী ইরানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আলী রাজাইকে হ’\ত্যা করে। বিপ্লবোত্তর ইরানের অস্থির সময় ছিল সেটি।
রাজাইয়ের হ’\ত্যার পর তার উত্তরসূরি হিসেবে আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। টানা আট বছর তিনি এই আনুষ্ঠানিক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তবে তার রাজনৈতিক যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তখনও বাকি ছিল।
যেভাবে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
১৯৮৯ সালের জুনে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ—ধর্মীয় আলেমদের একটি প্রভাবশালী পরিষদ—আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। কিন্তু সে সময় সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতার জন্য প্রয়োজনীয় ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ পদমর্যাদা তার ছিল না। বিষয়টি নিয়ে বিতর্কও দেখা দেয়।
পরে ইরানের সংবিধানে সংশোধন আনা হয়। সংশোধিত বিধানে বলা হয়, সর্বোচ্চ নেতার ইসলামের ওপর গভীর জ্ঞান থাকা আবশ্যক—এবং সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই আলী খামেনির নির্বাচনের পথ সুগম করা হয়। রাতারাতি তাকে হুজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়েছিল। সেই থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন ইরানের সর্বময় ক্ষমতার প্রতীক।


