সিয়াম সাধনার পবিত্র রমজান মাস চলছে। সারা দিন রোজা রাখার পর ইফতার অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকার পর হঠাৎ অস্বাস্থ্যকর ও ভারী খাবার গ্রহণ করলে এসিডিটিসহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্বাস্থ্যসম্মত ইফতার নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন ডাক্তার আইনুন নিশাত।
সদস্যভেদে ভিন্ন চাহিদা
ইফতারের আয়োজন করতে হবে পরিবারের সব সদস্যের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে। ছোটদের জন্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার একটু বেশি রাখার চেষ্টা করা উচিত। বয়স্কদের ক্ষেত্রে তাদের শারীরিক অবস্থা মাথায় রাখতে হবে। যেমন, পরিবারের কারো কিডনির সমস্যা থাকলে তার জন্য ডাল বা ডালজাতীয় ইফতারি এড়িয়ে চলাই ভালো। কারো হৃদরোগ থাকলে তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত খাবার না রাখাই উত্তম। আবার ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কেউ থাকলে তার জন্য মিষ্টিজাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে। অর্থাৎ সবার জন্য এক রকম ইফতার নয়—চাহিদাভেদে পরিকল্পনা জরুরি।
ইফতারের জন্য পানীয়
সারা দিনের পানিশূন্যতা দূর করতে ইফতারে পানীয়ের গুরুত্ব অনেক। এমন পানীয় বেছে নেওয়া উচিত, যা শুধু পিপাসা নিবারণই করবে না, বরং শরীরে শক্তিও জোগাবে।
লেবু-চিনির শরবত ইফতারের পরিচিত পানীয় হলেও অতিরিক্ত চিনি স্বাস্থ্যকর নয়। তাই ফলের জুস হতে পারে ভালো বিকল্প। পেঁপে, বেল, তরমুজ, আনারস বা মাল্টার জুস খাওয়া যেতে পারে। কখনো চিনিমুক্ত মিল্কশেক বা টক দইয়ের লাচ্ছিও ভালো বিকল্প। চিড়ার শরবতও শরীরের জন্য উপকারী।
খেজুর ও ফলের গুরুত্ব
খেজুর উচ্চ ক্যালরি ও ফাইবারসমৃদ্ধ ফল। এটি দ্রুত শক্তি জোগানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। ইফতারে প্রতিদিন অন্তত দুটি খেজুর রাখা উচিত। পাশাপাশি আপেল, পেয়ারা, নাশপাতি, বরই, তরমুজের মতো চিবিয়ে খাওয়া যায় এমন ফল বেশি রাখা ভালো।
ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলুন
ইফতারে জিলাপি, পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, নিমকি, পাকোড়াসহ ডালের বেসনে তৈরি নানা ভাজাপোড়া খাবার জনপ্রিয় হলেও এগুলো গ্যাস্ট্রিক, কোষ্ঠকাঠিন্য, এমনকি রক্তে ইউরিক এসিড বৃদ্ধির মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই এসব খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। একেবারে বাদ দেওয়া সম্ভব না হলে দিনে একটি আইটেমের বেশি না খাওয়াই ভালো।
স্বাস্থ্যকর ইফতারের সম্ভাব্য তালিকা
চিনি ছাড়া এক গ্লাস পেঁপে, বেল বা আনারসের জুস; দুটি মাল্টা বা তরমুজের জুস; অথবা চিনিমুক্ত মিল্কশেক কিংবা টক দইয়ের লাচ্ছি।
চিড়ার শরবত কিংবা দই-চিড়া রাখা যেতে পারে।
প্রতিদিন দুটি খেজুর।
বিভিন্ন ফল থাকলে প্রতিটির একটি করে টুকরা নেওয়া যেতে পারে।
শসা, ক্ষীরা ও পেয়ারা বেশি খাওয়া যেতে পারে।
একটি সেদ্ধ ডিম (কুসুমসহ)।
আধা কাপ বুট ভুনা ও এক কাপ মুড়ি। হালিম থাকলে এক-দুই কাপ। তেলেভাজা যেকোনো একটি। বিকল্প হিসেবে দেড় কাপ ভেজানো চিড়া, এক কাপ দুধ বা টক দই এবং একটি কলা।
দই-চিড়া: পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য
দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর শরীরের প্রতিটি কোষে পুষ্টি ও পানির সঠিক জোগান দেওয়া জরুরি। আমাদের দেশে ইফতারে তেল-মসলাযুক্ত ভাজাপোড়ার আধিক্য দেখা যায়। কিন্তু খালি পেটে এসব খাবার এসিডিটি ও হজমের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। এর পরিবর্তে দই-চিড়া হতে পারে স্বাস্থ্যকর বিকল্প।
দই-চিড়া কেন উপকারী
তাৎক্ষণিক শক্তি: চিড়া সহজপাচ্য শর্করা। এটি দ্রুত গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে শক্তি জোগায়।
প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক: দই প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। এটি প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক হিসেবে হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা কমায়।
ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধ: দই ও চিড়ার সমন্বয় শরীরের পানির ঘাটতি পূরণে সহায়ক।
টক দই কেন ভালো
বিশেষজ্ঞরা মিষ্টি দইয়ের বদলে টক দই ব্যবহারের পরামর্শ দেন। টক দই হজমে সহায়ক এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
যারা কিডনির সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য চিড়া তুলনামূলক নিরাপদ। এতে পটাশিয়াম ও সোডিয়াম কম থাকে। পাশাপাশি এটি অন্ত্রের প্রদাহ, আলসারেটিভ কোলাইটিস বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যায় উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
