সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এমন একটি নিরাপদ কাঠামো, যার মাধ্যমে সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হয়। আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের সামাজিক নীতির এটি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও এর প্রেক্ষাপট অত্যন্ত প্রাচীন। আজকের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সামাজিক নিরাপত্তা অপরিহার্য কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হলেও প্রাচীনকালেও এর বিভিন্ন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তখনকার সময়ে এটি সুসংগঠিত না হলেও দানশীলতা, মানবতাবোধ ও ধর্মীয় প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা হতো। প্রাচীন মিসর, গ্রিস, রোম, চীন ও ভারতে সামাজিক সহায়তার নজির রয়েছে। বিশ্বমানবতার মহান মুক্তিদূত হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬২২ সালে স্বাধীনতা, সাম্য ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে যে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, খোলাফায়ে রাশেদিনের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা সেই আদর্শকে অনুসরণ করে দীর্ঘদিন মানবকল্যাণে ভূমিকা রেখেছে।
ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারত্ব মানবসমাজের জন্য এক কঠিন অভিশাপ। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে ইসলাম কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি আর্থিক, মানবিক ও সামাজিক সহায়তার বিধান রেখেছে। সম্পদ যাতে কেবল বিত্তবানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য দরিদ্রের একটি নির্দিষ্ট প্রাপ্য অধিকার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। একটি সুন্দর, ভারসাম্যপূর্ণ ও উন্নত সামাজিক পরিবেশ গঠনে সামর্থ্যবান মুসলমানদের ‘নিসাব’ পরিমাণ সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের কল্যাণে ব্যয় করার নির্দেশ রয়েছে। এর মাধ্যমে অসহায় মানুষের দুর্দশা লাঘবের পাশাপাশি আয়বণ্টনে বৈষম্যও হ্রাস পায়। মূলত সমাজে ধনসম্পদের আবর্তন ও বিস্তার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের মহান উদ্দেশ্যেই জাকাত ব্যবস্থার প্রবর্তন। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তিত না হয়।”
ধনীদের সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ অসহায়-দরিদ্রদের মধ্যে জাকাত হিসেবে বিতরণ করা হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যের কঠোর বাস্তবতা থেকে মুক্তির সুযোগ পায়। ইসলামি বিধান অনুসারে জাকাতের মাধ্যমে ঋণগ্রস্ত, অনাথ, বিধবা, বৃদ্ধ, রুগ্ণ, পঙ্গু ও অক্ষম মানুষ তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে। এটি শুধু দান নয়; বরং একটি সুসংগঠিত সম্পদ বণ্টনব্যবস্থা।
জাকাতের অর্থ কার্যকর ব্যবস্থাপনায় অভাবী মানুষের হাতে পৌঁছালে তা ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনে বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারে। ধনীরা যদি যথাযথভাবে জাকাত আদায় করেন, তবে সমাজে অন্নহীন, বস্ত্রহীন, আশ্রয়হীন কিংবা শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তাদের ধনসম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক।” অর্থাৎ জাকাত কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি প্রাপকের অধিকার।
ইসলামি শরিয়তে জাকাতকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। নামাজ কায়েমের নির্দেশের পরপরই বহু ক্ষেত্রে জাকাত আদায়ের নির্দেশ এসেছে। কোরআনের ১৬টি স্থানে এটি ‘সাদাকাহ’ শব্দে ব্যবহৃত হয়েছে। একইভাবে ভূমির উৎপাদিত ফসলের ওপর প্রদেয় জাকাতকে ‘উশর’ বলা হয়েছে। গচ্ছিত অর্থ, স্বর্ণ-রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য, গৃহপালিত পশু, খনিজসম্পদ এবং কৃষিজ উৎপাদনের ওপর জাকাত ফরজ করা হয়েছে। এর ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোরআনের ৩২টি স্থানে সরাসরি জাকাত প্রদানের নির্দেশ রয়েছে। খলিফা আবু বকর (রা.) জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন এবং তাদের জাকাত প্রদানে বাধ্য করেছিলেন।
জাকাতের মূল লক্ষ্য হলো গ্রহীতাকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা—অর্থাৎ তাকে গ্রহণকারীর পর্যায় থেকে দাতার পর্যায়ে উন্নীত করা। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রচলিত অনেক পদ্ধতিতে জাকাত বণ্টনের ফলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটছে না। অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষকে জাকাতের কাপড় বা অর্থ সংগ্রহের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, যা আত্মসম্মানবোধে আঘাত হানে এবং নির্ভরশীলতার মানসিকতা তৈরি করে।
জাকাত প্রকৃত অর্থে সামাজিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি হতে পারে, যদি তা পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। সরকারি উদ্যোগে বাধ্যতামূলকভাবে জাকাত সংগ্রহ এবং সুশৃঙ্খল পরিকল্পনার ভিত্তিতে বণ্টনের ব্যবস্থা করা গেলে দেশের দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ গঠনে জাকাতব্যবস্থা তাই আজও প্রাসঙ্গিক এবং কার্যকর এক সামাজিক নীতি।


