স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ার কি সত্যিই ‘বিতর্কের আসন’? নতুন দায়িত্বে সালাহউদ্দিন আহমদের সামনে পুরনো প্রশ্ন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ারটাই যেন এক অদ্ভুত প্রতীক। এই চেয়ারে যিনিই বসেন, খুব বেশিদিন পেরোনোর আগেই তাকে ঘিরে বিতর্ক দানা বাঁধে। কথার লাগাম ছুটে যায়, আর সেই কথাই হয়ে ওঠে আলোচনার, কখনও বা হাস্যরসের খোরাক। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও এই ‘লিগ্যাসি’ থেকে বের হতে পারেননি। এখন প্রশ্ন—নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কি পারবেন এই চক্র ভাঙতে?

বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পর থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের আচরণ ও বক্তব্য নিয়ে জনপরিসরে এক ধরনের ধারা লক্ষ্য করা যায়। দু-একজন ব্যতিক্রম থাকলেও বেশিরভাগ সময়েই তাদের মন্তব্য এমন হয়েছে, যা জনমনে রসিকতার জন্ম দিয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কও উসকে দিয়েছে। ফলাফল—তাদের গুরুতর বক্তব্যও অনেক সময় গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে, ঠাট্টার উপাদানে পরিণত হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বক্তব্যের আরেকটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো একই ধরনের বাক্য বারবার উচ্চারণ করা। এমনভাবে বলা হয় যেন সেটিই প্রথমবার উচ্চারিত হলো। “উই আর লুকিং ফর শত্রুজ”, “আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে”, “দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো”, কিংবা “বিএনপির লোকেরা পিলার ধরে নাড়া দিয়েছে বলে রানা প্লাজা ভেঙে গেছে”, এমনকি “পুলিশ থেকে দূরে থাকুন”—এসব বাক্য এখন কার্যত ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বচন’ হিসেবেই পরিচিত।

মবের আলোচনায় পেঁয়াজের দাম

অতীতের অনেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বক্তব্য ও আচরণের দিক থেকে ছাপিয়ে গেছেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে, কারণ তাকে একইসঙ্গে স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

সাংবাদিকরা যখন দেশের নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা বিশেষ করে মব-সন্ত্রাস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তখন তিনি প্রায়ই পেঁয়াজ ও আলুর দাম নিয়ে কথা বলেছেন। থানা বা পুলিশি কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের কাছে তাদের রান্নাবান্নার খোঁজ নেওয়াও আলোচনায় আসে। এসব আচরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রলের জন্ম দেয়।

গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ৩টায় নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেন। রাত ২টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ হঠাৎ করেই তার সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দেয়। প্রশ্ন ওঠে—গভীর রাতে কেন এই সংবাদ সম্মেলন? সকালে করলে কি কোনো সমস্যা হতো?

আরও বিস্ময়ের বিষয়, ‘জরুরি’ আখ্যা দেওয়া সেই সংবাদ সম্মেলনে এমন কোনো তাৎক্ষণিক বা সংকটপূর্ণ ঘোষণা ছিল না, যা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারত না। ফলে রাতের ওই আয়োজনকে ঘিরে জনমনে আরও কৌতূহল ও সমালোচনা তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই জনমনে একই প্রশ্ন ফিরে আসে—এই চেয়ারের ‘বিতর্ক-ঐতিহ্য’ কি ভাঙা সম্ভব? নাকি আবারও কোনো বক্তব্য, কোনো আচরণ, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে?