ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন প্রয়াত নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি (Ayatollah Ali Khamenei)-এর ছেলে মোজতবা খামেনি (Mojtaba Khamenei)। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি (IRGC)-এর প্রভাব ও চাপের মুখে ‘এসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ তাকে এই পদে নির্বাচিত করেছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে থেকে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সক্রিয় থাকা এই ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এখন দেশটির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় প্রধানের দায়িত্বে।
১৯৬৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মাশহাদ (Mashhad) শহরে এক ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেওয়া মোজতবা, ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির সন্তান। ১৯৮৭ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পরপরই তিনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীতে যোগ দেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে কোম শহরের সেমিনারিতে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং সেখানে শিক্ষকতাও করেন। ধর্মীয় শিক্ষার পরিধি ও প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে থাকেন।
মোজতবা খামেনি মূলত ‘অফিস অব দ্য সুপ্রিম লিডার’-এর একজন প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। বাবার দপ্তরে কাজ করার সুবাদে সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্তিশালী যোগাযোগ গড়ে ওঠে তার। তাকে অনেকেই ইরানের ক্ষমতার অন্যতম কারিগর বা ‘পাওয়ার ব্রোকার’ হিসেবে বিবেচনা করতেন। তবে এই ক্ষমতার বিস্তার ছিল বিতর্কমুক্ত নয়। ২০০৫ ও ২০০৯ সালের নির্বাচনে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিজয়ের পেছনে নেপথ্য ভূমিকা রাখার অভিযোগ বহুবার উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
বিশেষ করে ২০০৯ সালের নির্বাচন-পরবর্তী আন্দোলন এবং ২০২২ সালে জিনা মাহসা আমিনীর মৃত্যুর পর দেশব্যাপী চলা বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠোরভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, পর্দার আড়াল থেকেই তিনি নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনও স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি।
২০২২ সালের আগস্টে কোম সেমিনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মাধ্যম তাকে ‘আয়াতুল্লাহ’ উপাধিতে ভূষিত করে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, একজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা হিসেবে যে উচ্চতর পাণ্ডিত্য ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এই উপাধি প্রাপ্তি ছিল ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পথ সুগম করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তার এই উপাধি ব্যবহারের ঘটনাকে উত্তরসূরি হওয়ার পূর্বপ্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দেখা হয়েছিল।
বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি এমন এক সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, যখন দেশটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং আঞ্চলিক সংকট—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। এতদিন বাবার ছায়ায় থেকে ক্ষমতার নেপথ্য চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করলেও, এখন তাকে প্রকাশ্যেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব সামলাতে হবে। ইরানের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ ছায়ার আনুষ্ঠানিক উত্থান ঘটল—এমন মন্তব্যও করছেন পর্যবেক্ষকরা।


