ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি, হরমুজে অনিশ্চয়তা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক হামলার পরবর্তী সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তেল উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ায় বুধবার (৪ মার্চ) বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১ ডলারেরও বেশি বেড়ে গেছে, যা জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স (Reuters) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১ দশমিক ১১ ডলার বা ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৮২ দশমিক ৫৩ ডলারে পৌঁছেছে—যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) অপরিশোধিত তেলের দাম ৭৯ সেন্ট বা ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৭৫ দশমিক ৩৭ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

মঙ্গলবার ইসরায়েলি ও মার্কিন বাহিনী ইরানজুড়ে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এতে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদনের পরিমাণ বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশেরও কম, তবুও সরবরাহব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে।

পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল উৎপাদনকারী ইরাকও উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। মজুদের সীমাবদ্ধতা এবং রপ্তানি রুট বন্ধ থাকায় দেশটির দৈনিক প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন কমেছে, যা মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, রপ্তানি দ্রুত পুনরায় শুরু না হলে কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৩ মিলিয়ন ব্যারেল উৎপাদন বন্ধ করতে হতে পারে।

এদিকে ইরান হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বিশ্ব তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। পাঁচটি জাহাজে হামলার পর চতুর্থ দিনের মতো প্রণালিটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেল ট্যাঙ্কারগুলোকে এসকর্ট করতে পারে। তার মতে, এতে অপরিশোধিত তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হতে পারে। তিনি মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থ করপোরেশনকে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা এবং আর্থিক গ্যারান্টি প্রদানের নির্দেশও দিয়েছেন।

তবে জাহাজ মালিক ও বিশ্লেষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন—সামরিক এসকর্ট ও বীমা সুবিধা কি বিশ্ববাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট হবে? ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ ও জ্বালানি কোম্পানি বিকল্প রুট ও সরবরাহের উৎস খুঁজছে। ভারত ও ইন্দোনেশিয়া নতুন জ্বালানি উৎসের সন্ধানে রয়েছে। অন্যদিকে কিছু চীনা শোধনাগার রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে, যা বাজারে চাহিদা-সরবরাহের সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সৌদি তেল জায়ান্ট আরামকো (Saudi Aramco) হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে কিছু রপ্তানি রুট পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। একই সময়ে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউট (American Petroleum Institute)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত ৫ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল বেড়েছে—যা বিশ্লেষকদের অনুমিত ২ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেলের তুলনায় অনেক বেশি। সরকারি পরিসংখ্যান বুধবার প্রকাশিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা তাই শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে—যেখানে প্রতিটি সংঘাতের ঢেউ পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।