রংপুরে আ’লীগ নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য তৎপরতায় আতঙ্ক—জুলাইযোদ্ধা ও শহীদ পরিবার বলছে, ‘দে’\খে নে’\ওয়ার’ হু’\মকি বাড়ছে

রংপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য চলাফেরা ও সক্রিয়তায় শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন জুলাইযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। তাদের অভিযোগ, একাধিক মা’\মলায় জা’\মিন পেয়ে বের হওয়া আসামিরা এখন উল্টো মা’\মলার বা’\দী ও সা’\ক্ষীদের ‘দে’\খে নে’\ওয়ার’ হু’\মকি দিচ্ছে। এতে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে এসব পরিবারের সদস্যদের। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় উদ্বেগ আরও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

জুলাইযোদ্ধা ও শহীদ পরিবার সূত্রে জানা যায়, তারা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হ’\ত্যাসহ বিভিন্ন মা’\মলা করেছেন। পাশাপাশি পুলিশও বা’\দী হয়ে রাষ্ট্রদ্রোহ ও না’\শকতার মা’\মলা করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এসব মা’\মলার কিছু আ’\সামিকে গ্রে’\প্তার করা হয়েছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দলীয় সরকার গঠিত হওয়ার পর একের পর এক মা’\মলার আ’\সামিরা জা’\মিন পেতে শুরু করেন। আর জা’\মিনে বেরিয়েই অনেকে মা’\মলার বা’\দী ও সা’\ক্ষীদের হু’\মকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, এসব বিষয়ে পুলিশকে জানালেও কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। বরং পুলিশের কিছু কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাহস জোগাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)–এর কিছু নেতাও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করছেন। ফলে জুলাই বিপ্লবের সময় হ’\ত্যাসহ বিভিন্ন গুরুতর মা’\মলার আ’\সামিরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করার সাহস পাচ্ছে।

সূত্র জানায়, হ’\ত্যাসহ গুরুতর মা’\মলার আ’\সামি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (Bangladesh Awami League) ও এর অঙ্গ সংগঠনের পদধারী অনেক নেতাকর্মী প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ জা’\মিনে বেরিয়ে মা’\মলার বা’\দী ও সা’\ক্ষীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেই অভিযোগ।

অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা কম থাকায় এবং পুলিশের অনেক কর্মকর্তা ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগী হওয়ায় জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার আওয়ামী লীগের নেতারা নিরাপদে রয়েছেন। গঙ্গাচড়ায় প্রকাশ্যে দলীয় তৎপরতা চালাচ্ছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান বাবলু, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন, সাংগঠনিক সম্পাদক লাইবুল ইসলাম লেবু, কোষাধ্যক্ষ সোহারাব রাজু ও খালেকসহ আরও অনেকে। উপজেলার আরও অন্তত ২০ থেকে ২৫ জনের বিরুদ্ধে গঙ্গাচড়া মডেল থানায় মা’\মলা থাকলেও তাদের কাউকেই গ্রে’\প্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ।

পীরগাছা উপজেলাতেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, পুলিশ ও বিএনপির কিছু নেতার যোগসাজশে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ্ আল মাহমুদ মিলন, সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান, কুদ্দুছ ভূঁইয়া, উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি টাকুয়া শফিকুল, অর্থের যোগানদাতা আব্দুর রহিম এবং ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক ও অপসারিত ইউপি চেয়ারম্যান নুর আলমসহ অসংখ্য নেতাকর্মী প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন। তারা শেখ হাসিনা ফিরে আসার কথা বলেও আন্দোলনকারীদের পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ।

বদরগঞ্জে জুলাইযোদ্ধাদের অভিযোগ, সাবেক পৌর মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি উত্তম কুমার সাহা একাধিক মা’\মলার আ’\সামি হলেও পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। পাশাপাশি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল করিম পান্না, তাজুল ইসলাম, সাবেক এমপি ডিউক চৌধুরীর ভাই লিটন চৌধুরী, পলিন চৌধুরী এবং লিঙ্কন চৌধুরীসহ আরও অনেকে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং মা’\মলার বা’\দী ও সা’\ক্ষীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সভাপতি বকুল এবং পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র শামীম মিলে দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—বিএনপির কিছু নেতার ওপর ভরসা রেখে তারা আবারও মাঠ গোছানোর চেষ্টা করছেন। এমনকি পুলিশের পক্ষ থেকে এখনই তাদের গ্রে’\প্তার করা হবে না—এমন আশ্বাসও নেতাকর্মীদের দেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

মিঠাপুকুর উপজেলাতেও আওয়ামী লীগের রাশেক রহমান এবং পলাতক এমপি জাকির হোসেন নেতাকর্মীদের সক্রিয় থাকার জন্য বিভিন্নভাবে উজ্জীবিত করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা অব্যাহত থাকলে এবং এসব আ’\সামিকে দ্রুত গ্রে’\প্তার না করা হলে যে কোনো সময় বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারে।

জুলাই বিপ্লবের পক্ষে থাকা পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুলিশের ভেতরেও এখনো আওয়ামী লীগের সুবিধা নেওয়া কর্মকর্তার সংখ্যা অনেক বেশি। তারা এখনো দলটিকে পুনর্বাসনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে গ্রে’\প্তারের নির্দেশ থাকলেও মাঠ পর্যায়ে অনেক সদস্য তা মানছেন না বলেও অভিযোগ ওঠে।

এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (Anti-Discrimination Student Movement)–এর রংপুর মহানগর আহ্বায়ক ইমতিয়াজ হোসেন বলেন, যারা আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালিয়েছে, আহত করেছে, এমনকি হ’\ত্যার মতো ঘটনায় জড়িত—তাদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুলিশ তাদের না ধরে নীরব ভূমিকা পালন করছে। এতে আমরা উদ্বিগ্ন। আমাদের পরিবারও শঙ্কিত হয়ে পড়েছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (Begum Rokeya University)–এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. তানজিউল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রের আইনগত দায়িত্ব হলো অপরাধীদের গ্রে’\প্তার করা। যারা জুলাইয়ের হ’\ত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল এবং যারা প্রকৃত অপরাধী—তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।

এ বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (Rangpur Metropolitan Police)–এর কমিশনার মজিদ আলী বলেন, পুলিশ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যেভাবে নির্দেশনা আসে সেভাবেই আমরা কাজ করছি। কেউ অপরাধ করলে বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার চেষ্টা করলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রংপুর রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি আমিনুল ইসলামও বলেন, অপরাধীদের কোনো স্থান নেই। যারা অপরাধ করেছে বা অপরাধ করার চেষ্টা করবে—পুলিশ অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধরার জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্দেশ দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।