রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে আগামী ১০ মার্চ নতুন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)। এর আগে তার বগুড়া সফরের কথা থাকলেও বগুড়া-৬ (সদর) আসনের আসন্ন উপনির্বাচনের কারণে সেই কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে এ তথ্য জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন (A Z M Zahid Hossain)।
এরই মধ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় (Ministry of Social Welfare) ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ নামে একটি নীতিমালা চূড়ান্ত করেছে। ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’—এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি নীতিমালাটি খুব শিগগিরই প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে।
নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, নিম্ন-মধ্যম ও উচ্চ আয়ের কয়েকটি শ্রেণির মানুষ এ কার্ডের সুবিধা পাবেন না। যেমন—পরিবারের কেউ যদি সরকারের পেনশনভোগী হন, বাড়িতে এসি ব্যবহার করা হয় বা গাড়িসহ বিলাসবহুল সম্পদের মালিকানা থাকে। এছাড়া পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি চাকরিজীবী হলে কিংবা বাণিজ্যিক লাইসেন্সধারী বড় ব্যবসা থাকলেও সেই পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের আওতার বাইরে থাকবে।
তবে প্রকৃত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়। ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা পরিবার এই কার্ড পাবে। একই সঙ্গে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মধ্যে হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবার এবং শূন্য দশমিক পাঁচ একর বা তার কম জমির মালিক পরিবারও এর আওতায় আসবে। বিশেষ করে সুবিধাভোগী নারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সুবিধাভোগী নির্ধারণে সরকারের খানা জরিপ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ডেটাবেইস ব্যবহার করা হবে। সেখান থেকে প্রকৃত ও উপযুক্ত সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করে জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করা হবে।
জানা গেছে, সরকারি কোষাগার থেকে এ অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে (Trading Corporation of Bangladesh) ফ্যামিলি কার্ডের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ হিসেবে রূপান্তর করা হবে। একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে ওটিপি যাচাইয়ের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে এ কার্ডের মাধ্যমে শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকির মতো সুবিধাও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গাইডলাইনে ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটকে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৩টি ভিন্নধর্মী এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার কড়াইল বস্তি, চট্টগ্রামের পটিয়া, বান্দরবানের লামা, সুনামগঞ্জের দিরাই এবং ঠাকুরগাঁও সদরসহ বিভিন্ন অঞ্চল। এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের ঘনত্ব, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং অনগ্রসরতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই পাইলটিং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট দুই কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশ অর্থ সরাসরি দরিদ্র পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছাবে।
নীতিমালায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ৯৫টির বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। কিন্তু এসব কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা গ্রহণ এবং প্রায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ প্রকৃত দরিদ্রের বাদ পড়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও রয়েছে। এসব জটিলতা দূর করে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
দীর্ঘমেয়াদে ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’-এ রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সূত্র মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে ১৪টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এ কর্মসূচি চালু হবে। প্রতিটি উপজেলায় একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত নারীদের এই কার্ড দেওয়া হবে। এর আওতায় প্রত্যেক পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে।
প্রথম ধাপে দেশের প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হতদরিদ্র পরিবার এই কার্ড পাবে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে প্রায় দুই কোটি দরিদ্র পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসূচিটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে নগদ ভাতা ও টিসিবির সহায়তাসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা এক কার্ডের অধীনেই পরিচালিত হবে।
