ঈদকে ঘিরে রাজধানীর মার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়, ফুটপাতেও জমজমাট বেচাকেনা

ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর মার্কেট ও বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। ছুটির দিনে সেই ভিড় আরও বেড়ে গিয়ে রীতিমতো জনসমুদ্রে পরিণত হচ্ছে বিভিন্ন শপিংমল ও ফুটপাতের বাজার।

গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনে সরেজমিনে রাজধানীর পান্থপথের বসুন্ধরা সিটি শপিংমল (Bashundhara City Shopping Mall)সহ একাধিক মার্কেট ও বিপণিবিতান ঘুরে দেখা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকাজুড়ে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। নামি-দামি শপিংমল থেকে শুরু করে সাধারণ দোকান, এমনকি ফুটপাত—সবখানেই চলছে বেচাকেনা। যেন রঙিন এক মেলায় পরিণত হয়েছে চারপাশ।

বসুন্ধরা সিটি শপিংমলে কেনাকাটা করতে আসা রুনা ইকবাল জানান, ঈদের আগে ভিড় আরও বাড়বে—এই আশঙ্কায় আগেভাগেই কেনাকাটা শেষ করতে চান তিনি। তার মতে, দেরি করলে মানুষের চাপের মধ্যে কেনাকাটা করা কঠিন হয়ে পড়বে। একই মলে আসা একাধিক ক্রেতা বলেন, পরিবার নিয়ে এখানে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করা যায়। জামা, শাড়ি, জুতা থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্য এক জায়গায় পাওয়া যায় বলেই এই মার্কেট তাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে।

অন্যদিকে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, নারীদের থ্রিপিস বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকা থেকে চার হাজার টাকার মধ্যে। দেশি কটন ও লিনেন কাপড়ের চাহিদা বেশি। জমকালো কাজের পোশাকের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। শাড়ির বাজারেও চাঙাভাব রয়েছে—দাম শুরু এক হাজার ৫০০ টাকা থেকে, যা গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায়। দোকানিরা জানিয়েছেন, মাঝামাঝি দামের কাপড়ের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি।

পুরুষদের পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। শিশুদের পোশাকের দাম কিছুটা বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। বাচ্চাদের ফ্রক ও পাঞ্জাবি-পায়জামা সেট পাওয়া যাচ্ছে ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। দোকানি দীন ইসলাম বলেন, বিক্রি এখনো পুরোপুরি জমেনি, তবে কয়েক দিনের মধ্যেই তা বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।

নিউমার্কেট এলাকার রহমান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রহমান আব্বাস জানান, ফেন্সি কাপড় ও লেহেঙ্গা কাপড়ের গজ ৫০০ থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাঞ্জাবির জন্য চিকেন কারি কাপড় প্রতি গজ ৪০০ টাকা এবং সিকোয়েন্স কাপড় ৩৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। নারীদের জামা ও মেক্সির জন্য লিনেন কাপড়ের গজ ৯৮ থেকে ১০০ টাকা, চায়না কাপড় ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশি কাপড়ের থ্রিপিস ৫৯০ থেকে তিন হাজার ২০০ টাকার মধ্যে এবং ভারতীয় ও পাকিস্তানি থ্রিপিস আড়াই থেকে ছয় হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। মাঝারি মানের ভারতীয় থ্রিপিসের চাহিদা বেশি, যার দাম ১ হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে।

পোশাক বিক্রেতা সিদ্দিকুর জানান, এ বছর নতুন স্টাইলের পোশাক এসেছে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের মধ্যে টি-শার্ট, জিন্স ও পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি। তবে পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বিক্রেতাদেরও কিছুটা চাপে পড়তে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর ফুটপাতের বাজারও এখন ব্যস্ত। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের অনেকেই তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে ফুটপাতের দিকেই ঝুঁকছেন। ভ্যানে সাজানো শার্ট-প্যান্ট, শিশুদের ফ্রক, থ্রিপিস ও টি-শার্ট—সবখানেই ঈদের আমেজ। ফুটপাতগুলোতে হাঁটার জায়গা নেই বললেই চলে। ক্রেতারা দাঁড়িয়ে দরদাম করছেন, পছন্দের কাপড় খুঁটিয়ে দেখছেন।

:contentReference[oaicite:0]{index=0} এলাকার সেজান পয়েন্ট মার্কেটের সামনের রাস্তায় ছোট দোকান নিয়ে বসেছেন রাজিব মোল্লা। অস্থায়ী ছাউনি দিয়ে সাজানো তার দোকানে নতুন শার্ট ও পাঞ্জাবি তুলেছেন ঈদ উপলক্ষে। তিনি জানান, ১৫ রমজান পেরিয়ে যাওয়ায় ক্রেতা বাড়ছে, বিক্রিও ভালো হচ্ছে।

বিভিন্ন মার্কেটের সামনে সারি সারি স্যান্ডেল, স্নিকার্স ও লোফার জুতা সাজানো। কারওয়ান বাজার এলাকায় জুতা বিক্রেতা হৃদয় বলেন, বেশিরভাগ পণ্যই ‘ঈদ কালেকশন’। রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তার। বিক্রি এখন পর্যন্ত মোটামুটি হলেও শেষ সময়ে তা বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।

ক্রেতাদের ভিড়ে পঞ্চাশোর্ধ্ব মিজান চার জোড়া স্যান্ডেল কিনেছেন দরদাম করে ১ হাজার টাকায়। তিনি অভিযোগ করেন, ঈদের সময় দোকানিরা দাম বেশি হাঁকান। একই এলাকায় মার্কেট করতে আসা লাইলি বেগম জানান, গ্রামে থাকা নাতি-নাতনিদের জন্য জামা কিনবেন। তবে কোথাও কাপড় পছন্দ হলে দাম বেশি, আবার দামে মিললে মান পছন্দ হয় না—এমন দ্বিধায় ঘুরছেন তিনি।

রিকশাচালক আলমগীর জানান, দৈনিক আয় দিয়ে ফুটপাত থেকেই সন্তানদের জামা-কাপড় কিনেছেন। দিনমজুর রায়হান বলেন, পরিবারের সবার জন্য বড় মার্কেটে কেনাকাটা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সন্তানদের নতুন জামা-জুতার আবদার কীভাবে পূরণ করবেন—সে চিন্তাই তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

কল্যাণপুর থেকে নিউমার্কেটে আসা শারমিন বেগম ও রাহনুল দম্পতি জানান, সন্তানদের কেনাকাটা মার্কেটের ভেতর থেকে করলেও নিজেদের জন্য ফুটপাতই ভরসা। দুই সন্তানের জন্য বাজেট ছিল ৩ হাজার টাকা, কিন্তু খরচ হয়েছে ৫ হাজারের বেশি। তাই নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস কম দামে কিনতে ফুটপাত ঘুরছেন তারা।

ঈদের পোশাকের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে নিউমার্কেট (New Market, Dhaka) এলাকার ব্যবসায়ীরা বলেন, এবার পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় দাম নাগালের মধ্যেই রয়েছে। :contentReference[oaicite:1]{index=1}–এর যুগ্ম আহ্বায়ক ইউসুফ আলী শামীম দাবি করেন, গত বছর পোশাকের দাম ৩০ শতাংশ বাড়লেও এবার বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে। ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।