মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমির আকাশে এখন যুদ্ধের অশনি সংকেত। সেই অস্থিরতার মাঝখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে গত সাত দিন ধরে ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় পার করছেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা (MV Banglar Joyjatra)-এর ৩১ জন নাবিক। মাথার ওপর ঘুরে বেড়ানো ড্রোনের গুঞ্জন আর চারপাশে ক্ষে’\পণাস্ত্র বিস্ফোরণের বিকট শব্দে প্রতিটি মুহূর্ত যেন পরিণত হয়েছে আতঙ্কের প্রহরে।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) রাতে জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান (Md Shafiqul Islam Khan) এক ভিডিও বার্তায় জানান, জেবেল আলী বন্দর (Jebel Ali Port)-এর ১০ নম্বর টার্মিনালে নোঙর করে থাকা অবস্থায় প্রায় প্রতিদিনই আশপাশে তীব্র সামরিক তৎপরতা চোখে পড়ছে।
তার ভাষায়, জাহাজ থেকে প্রায় প্রতিদিনই আকাশে মিসাইল ও ড্রোন উড়তে দেখা যায়। মাঝেমধ্যেই আকাশে বিস্ফোরণ ঘটে, আর বন্দরের আশপাশ থেকেও ভেসে আসে বিকট শব্দ। এসব দৃশ্য ও শব্দ নাবিকদের মধ্যে বাড়িয়ে দিচ্ছে গভীর উদ্বেগ।
জাহাজের ডেক থেকে তাকালেই দেখা যায় আকাশে ছুটে চলা মিসাইলের তীব্র আলো। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে কাতার (Qatar) থেকে দুবাইয়ের উদ্দেশে যাত্রা করে জাহাজটি এবং পরে জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়।
কিন্তু পণ্য খালাস শুরুর আগেই পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইরান (Iran), যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব এসে পড়ে এই বন্দরের পরিবেশে।
ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, গত শনিবার জাহাজ থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে একটি তেল সংরক্ষণাগারে ক্ষে’\পণাস্ত্র আঘাত হানে। সেই বিস্ফোরণের বিকট শব্দ আর আগুনের লেলিহান শিখা নাবিকদের মনে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
তিন দশকের দীর্ঘ নাবিক জীবনে এমন জীবন-মরণ পরিস্থিতির মুখোমুখি আগে কখনো হতে হয়নি বলে জানান তিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে—বিশেষ করে চাঁদপুরসহ নানা জেলায় থাকা ৩১টি পরিবারের সদস্যরা এখন প্রতিনিয়ত ফোনে যোগাযোগ করছেন। অনেকেই উদ্বেগ আর কান্না সামলাতে পারছেন না।
ক্যাপ্টেন বলেন, পরিবারের সদস্যদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেও নিজের ভেতরের দুশ্চিন্তা লুকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। জাহাজে আপাতত পর্যাপ্ত খাবার ও পানির মজুত থাকলেও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি পুরো পরিবেশকে ভারী করে তুলেছে।
জেবেল আলী বন্দরে বর্তমানে প্রায় একশর মতো জাহাজ অবস্থান করছে। তবে চারপাশের অস্থির পরিস্থিতি ‘বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকদের মনে তৈরি করেছে গভীর অনিশ্চয়তা।
পণ্য খালাস শেষ হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। কিন্তু এরপর কী হবে—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে। জাহাজটি ভাড়া নেওয়া বিদেশি কোম্পানি এখনো পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণ করেনি। ফলে ৩১ জন নাবিকের ভবিষ্যৎ আপাতত ঝুলে আছে যুদ্ধ পরিস্থিতির তীব্রতা এবং ওই কোম্পানির সিদ্ধান্তের ওপর।
এদিকে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (Bangladesh Shipping Corporation)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক (Commodore Mahmudul Malek) জানিয়েছেন, সরকার ও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।


