চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের ধরতে বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানের পথ রোধ করতে সড়কে ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখা এবং খালের ওপরের কালভার্ট ভেঙে দেওয়ার মতো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় বাহিনীকে। অভিযানে অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে এবং কিছু আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (৮ মার্চ) ভোর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (Bangladesh Army), বাংলাদেশ পুলিশ (Bangladesh Police), র্যাব (Rapid Action Battalion) ও বিজিবি (Border Guard Bangladesh)-এর সমন্বয়ে তিন হাজারের বেশি সদস্য জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় কয়েক ভাগে অভিযান পরিচালনা করেন।
বিকেলে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক আহসান হাবীব পলাশ (Ahsan Habib Palash) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ভোর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও এপিবিএনের প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য অংশ নেন। অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল বিশাল এই এলাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং তা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, অভিযানের সময় জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকার সন্ত্রাসী সংগঠন ‘ইয়াসিন বাহিনী’র প্রধান মো. ইয়াসিন পালিয়ে গেছে। তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযানে কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রায় ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের পরিচয় পরে জানানো হবে।
ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ আরও জানান, দুর্গম এই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেখানে স্থায়ীভাবে দুটি ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—একটি পুলিশের এবং অন্যটি র্যাবের। আজ থেকেই এই দুই ক্যাম্প কার্যক্রম শুরু করবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতেই আগে থেকেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল। আলীনগরে ঢোকার প্রধান সড়কে একটি বড় ট্রাক রেখে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই এলাকায় খালের ওপরের কালভার্টটিও ভেঙে দেওয়া হয়, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যানবাহন প্রবেশ করতে না পারে। পরে খালে ইট, বালি ও সিমেন্ট ফেলে অস্থায়ীভাবে রাস্তা তৈরি করে যান চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়।
অভিযান চলাকালে নিরাপত্তার কারণে সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁজোয়া যানও মোতায়েন রাখা হয়।
কর্মকর্তারা জানান, জঙ্গল সলিমপুরে বর্তমানে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে আছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। গত জানুয়ারিতে ওই এলাকায় অভিযানে যাওয়া এক র্যাব কর্মকর্তাকে হ’\ত্যা মামলার প্রধান আসামিও ইয়াসিন। স্থানীয়দের দাবি, আলীনগর এলাকায় তার দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে।
প্রশাসনিকভাবে জঙ্গল সলিমপুর সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও এলাকাটিতে প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। বায়েজিদ লিংক রোড হয়ে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান পাশে অবস্থিত এই বিশাল এলাকা প্রায় তিন হাজার ১০০ একর খাস জমিজুড়ে গড়ে উঠেছে। টিলা কেটে তৈরি হওয়া এই ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ধীরে ধীরে সন্ত্রাসীদের এক ধরনের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
২০২২ সালে এই খাস জমি দখলমুক্ত করে সেখানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ এবং ইকো পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেয় সরকার। তবে উচ্ছেদ অভিযানে একাধিকবার বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে সেখানে পাহাড় ব্যবস্থাপনা ক্যাম্প ও চেকপোস্ট স্থাপন করে জেলা প্রশাসন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকাটিতে আবারও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এরপর কয়েক দফা সংঘর্ষ ও হ’\ত্যা ঘটনা ঘটায় পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

