ট্রাম্পের ইঙ্গিতে কমল তেলের দাম, যুদ্ধ শেষের আভাসে স্থিতিশীলতার পথে বৈশ্বিক বাজার

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর এমন ইঙ্গিতের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আবারও কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে শুরু করেছে। সোমবার টানা নাটকীয় ২৪ ঘণ্টার অস্থিরতার পর তেলের দাম চার বছরের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে দ্রুত নেমে আসে।

অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সোমবার ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১১৯ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছায়। তবে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, তেলের দাম সম্ভবত তিনি যতটা ভেবেছিলেন তার চেয়েও কম বেড়েছে। একই সঙ্গে তিনি দ্রুত বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার উদ্যোগ নেন।

সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধকে ‘প্রায় পুরোপুরি, মোটামুটি সম্পন্ন’ বলে উল্লেখ করেন। তার এই মন্তব্য প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। আন্তর্জাতিক ব্রেন্ট তেলের দাম দ্রুত নেমে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ৫৮ ডলারে দাঁড়ায়।

তবে বাজারে লেনদেন শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প আবারও কিছু পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করেন, যা ইঙ্গিত দেয় সংঘাত পুরোপুরি শেষ নাও হতে পারে। তিনি বলেন, “আমরা অনেক দিক থেকেই জিতেছি, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি ইরান এমন কিছু করে যাতে হরমুজ প্রণালি (Strait of Hormuz) দিয়ে তেল প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে এর আগের আঘাতের চেয়ে বিশ গুণ বেশি শক্তভাবে আঘাত করবে।

বিশ্বের মোট তেল পরিবহন এবং সমুদ্রপথে গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কারের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। গত এক সপ্তাহ ধরে এটি কার্যত বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায় এবং সেই আশঙ্কাই তেলের দাম বাড়িয়ে তোলে।

এদিকে মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে—যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে ওই অঞ্চল থেকে এক লিটার তেলও রপ্তানি করতে দেওয়া হবে না। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি (IRGC)-এর এক মুখপাত্রের বরাতে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।

সংঘাতের এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নড়াচড়া শুরু হয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন (Emmanuel Macron) সোমবার ইঙ্গিত দেন, সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায় শেষ হলে কয়েকটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যপথ সচল রাখতে কনটেইনারবাহী জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে সশস্ত্র নিরাপত্তা দিতে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করতে পারে।

অনলাইন আল জাজিরা (Al Jazeera)-এর খবরে বলা হয়েছে, এ উদ্দেশ্যে আটটি জাহাজ মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছেন ম্যাক্রন, যার মধ্যে দুটি ইতোমধ্যে উপসাগর অঞ্চলের পথে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা আস্থা ফিরিয়ে এনেছে। কোভিড-১৯ মহামারির তীব্র সময় এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পরবর্তী সময়ের পর সোমবারই ছিল বৈশ্বিক অর্থবাজারের সবচেয়ে অস্থির দিনগুলোর একটি। এরপরই তেলের দাম দ্রুত পড়ে যায়।

এদিকে ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র কিছু তেল-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথাও জানিয়েছে। যদিও ট্রাম্প সরাসরি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে এই ঘোষণা আসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার কথা বলার কিছু সময় পর। বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর ওপর চাপ সৃষ্টি করার যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকে জটিল করে তুলতে পারে।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “কিছু দেশের ওপর আমাদের নিষেধাজ্ঞা আছে। প্রণালি আবার চালু না হওয়া পর্যন্ত আমরা সেসব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেব।”

গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলোকে ৩০ দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে রাশিয়ার তেল কেনার অনুমতি দেয়। অথচ মাত্র এক মাস আগেই ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ভারত রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধে সম্মত হয়েছে। তার মতে, এতে রাশিয়ার আয়ের একটি বড় উৎস বন্ধ হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে সহায়তা করবে।