মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে—উদ্বেগ, সংকট ও অনিশ্চয়তার এক বাস্তবতা

ইসরাইল–আমেরিকা–ইরান সংঘাতের মধ্যে বিশ্ব রাজনীতির পাশাপাশি গভীর উদ্বেগের মুখে পড়েছে বাংলাদেশও। টানা এগারো দিনের এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে বাংলাদেশিদের রক্ত ঝরার খবর দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইতোমধ্যেই পাঁচজন বাংলাদেশির মৃ’\ত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আ’\হত হয়েছেন আরও কয়েকজন।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা হাজার হাজার বাংলাদেশি এখন দেশে ফিরতে চান। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আকাশপথ ও নৌপথ—প্রায় সব যোগাযোগই কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। ফলে দেশে ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না অনেকে।

এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতিতেও। জ্বালানি সংকট তীব্র আকার নিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ তেল সংগ্রহ করছেন। জ্বালানি সংকটের প্রভাবে অনেক জায়গায় সড়কে যান চলাচলও কমে গেছে।

তবে এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। এখন পর্যন্ত দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে সহনীয় অবস্থায় রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে এখনো বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়নি। যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকটের সময় অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা দেখান। কিন্তু অন্তত এখন পর্যন্ত সেই প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার খুব বেশি সময় হয়নি। এর আগে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল—বিশেষ করে জ্বালানি খাতে। ফলে বর্তমান প্রশাসনকে অনেক ক্ষেত্রে অগোছালো পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক দিক থেকেও দেশ এখনো কয়েক ভাগে বিভক্ত। এই বিভক্ত বাস্তবতায় জাতীয় পর্যায়ে দ্রুত ও ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণ, যার প্রতিফলন যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াতেও অনেকেই লক্ষ্য করেছেন।

দীর্ঘ সময় ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মধ্যস্থতাকারী বা কূটনৈতিক সক্রিয়তার ভূমিকায় বাংলাদেশকে খুব বেশি দেখা যায়নি। ৫৫ বছরের ইতিহাসে অনেক বিশ্লেষকের মতে, কেবল জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman)-এর সময়—বিশেষ করে সত্তর ও আশির দশকে—বাংলাদেশকে তুলনামূলকভাবে সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা রাখতে দেখা গিয়েছিল। সেই সময়ের উদ্যোগগুলো এখনও নানা আলোচনায় উঠে আসে।

প্রশ্ন উঠছে—এরপর কেন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সংকটে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি? অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক অনৈক্য, নৈতিক অবস্থানের দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের সামনে দ্রুত নতি স্বীকার করার প্রবণতা। পাশাপাশি কূটনৈতিক সক্ষমতার ঘাটতির কথাও বলা হয়।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান মূলত পর্যবেক্ষকের মতো। সরকার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এবং জনপ্রতিক্রিয়ার মধ্যেই তাদের অবস্থান প্রকাশ করছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।

যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এই বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিকে ঘিরে সংকট আরও গভীর হতে পারে। বিশেষ করে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই বাস্তবতায় অনেকেই একটি জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। সংসদের অধিবেশন বসছে ১২ মার্চ। জনগণের দৃষ্টি এখন সেদিকেই। সেখানে কি এই সংকট মোকাবিলায় কোনো সর্বদলীয় কমিটি গঠন করা হবে? নাকি আগের মতো রাজনৈতিক মতবিরোধ, ওয়াকআউট বা বয়কটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে আলোচনা—এই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত অনেকেরই মত—বাংলাদেশের সামনে এখন ভুল করার সুযোগ নেই। একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো জাতিকে বড় সংকটে ফেলতে পারে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চয়ই এই বাস্তবতা অনুধাবন করেন—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।