ঈদ ও ২৬ মার্চ ঘিরে কুমিল্লায় সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ’লীগের

পবিত্র ঈদুল ফিতর (Eid-ul-Fitr) ও ২৬ মার্চকে কেন্দ্র করে কুমিল্লায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ (Awami League)-এর তৎপরতা বাড়ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে। জেলার বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে স্থানীয়রা বলছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী শিবিরে যেন আবারও প্রাণ ফিরে এসেছে। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের নেতাদের পাশাপাশি নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (Bangladesh Chhatra League)-এর নেতাকর্মীরাও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশে ঢুকছেন।

গত কয়েক দিন কুমিল্লা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) সরকারের পতনের পর বিপুলসংখ্যক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান নেন। এখন বিএনপি সরকার গঠনের পর তারা আবারও অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, হাতে গোনা কয়েকজনের পাসপোর্ট থাকলেও অধিকাংশ নেতাকর্মীরই কোনো পাসপোর্ট নেই। এ কারণে কুমিল্লা সীমান্তের বিভিন্ন অনিরাপদ পয়েন্ট ব্যবহার করে তারা দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজন নেতা-কর্মী দেশে ফিরেছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ভারত থেকে ফেরা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিছু নেতা কুমিল্লা আওয়ামী লীগের সাবেক কয়েকজন সংসদ সদস্যের অর্থায়নে বিদেশি অস্ত্র নিয়ে দেশে ঢুকেছেন। তাদের উদ্দেশ্য দেশের ভেতরে অরাজকতা সৃষ্টি করা। এসব সূত্র বলছে, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীর কাছে অস্ত্রের মজুত রয়েছে, যা নাকি সাবেক এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, সাবেক অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল, সাবেক এলজিইডি মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের অর্থায়নে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জুলাই বিপ্লবে ছাত্র হ’\ত্যার ডজনখানেক মামলার আসামি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন স্বপন ভারতে পালিয়ে যান। পরে তিনি দুবাইয়ে আশ্রয় নেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, গত শুক্রবার তিনি দেশে ফিরে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার বাকশিমুল গ্রামে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ডজনখানেক মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও তিনি কীভাবে দেশে প্রবেশ করলেন—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। অনেকের ধারণা, সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবেই তিনি দেশে ঢুকেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশে ফিরেই সাজ্জাদ হোসেন স্বপন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। দিনের আলোয় চলাফেরা করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করছে না—এমন অভিযোগও উঠেছে।

এদিকে আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party–BNP)-এর কোনো ভূমিকা আছে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক হাজী মোস্তাক মিয়া বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে কারো সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাদের সম্পর্ক আছে কি না, তা আমি জানি না। দলীয়ভাবে তাদের প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে নেই। কারণ তাদের কার্যক্রম তো নিষিদ্ধ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের কাজ চলতে পারে না।’

কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হঠাৎ করে আওয়ামী লীগ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন কিছু নামধারী বিএনপি নেতা—এমন অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, আশ্রয়-প্রশ্রয়ের নামে কিছু নেতা মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করছেন।

বিএনপির একাধিক নেতা জানান, কুমিল্লায় বিএনপির বড় মাপের কয়েকজন নেতা আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছেন। এমনকি কয়েকজন আওয়ামী লীগ চেয়ারম্যান ইতোমধ্যে বিএনপিতে যোগদানও করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় নেতাকর্মীরা আরও জানান, সাম্প্রতিক কয়েকটি ইফতার মাহফিলে আওয়ামী লীগের জেলা কমিটির সদস্য ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ইফতার করেছেন বিএনপির কয়েকজন এমপি। এতে তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

তাদের ভাষ্য, ‘যারা গত ১৭ বছর আমাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করেছে, ক্ষমতায় আসার এক মাসের মাথায় তাদের নিয়েই ইফতার করছেন আমাদের এমপিরা—এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।’

লাকসাম উপজেলা ছাত্রদলের নেতা মোহাম্মদ মহসিন বলেন, নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ গুপ্তভাবে লাকসামের বিভিন্ন এলাকায় অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। তবে বিএনপি প্রতিহিংসার রাজনীতি সমর্থন করে না। লাকসাম উপজেলা ছাত্রদল যেকোনো সন্ত্রাসী তৎপরতা রুখে দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party–NCP)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সমন্বয়ক এবং কুমিল্লা জেলার প্রধান সমন্বয়ক নাভিদ নওরোজ শাহ বলেন, ‘আগেও অভিযোগ ছিল তৃণমূলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এক ধরনের গোপন সম্পর্ক রয়েছে। নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য বিএনপি যোগসাজশ করেছে—এমন অভিযোগ উঠেছিল। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। জুলাই হ’\ত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাদের রাজনীতি করার সুযোগ নেই। বিএনপিকে আমরা আহ্বান জানাব, এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে।’

বিবির বাজার স্থলবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দেশে প্রবেশ করছেন কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিবির বাজার স্থলবন্দর ফাঁড়ির ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের স্থলবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে কেউ বাংলাদেশে প্রবেশ করার সুযোগ নেই। আমরা সতর্ক অবস্থায় আছি।’

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) রাশেদুল হক চৌধুরী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র হ’\ত্যার মামলায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। তিনি আরও জানান, যেহেতু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তাই তাদের প্রচারণাও নিষিদ্ধ।

সীমান্ত দিয়ে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশে ঢুকছেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা মূলত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (Border Guard Bangladesh–BGB)-এর দায়িত্ব। বিষয়টি তারা দেখবেন।

এ বিষয়ে বিজিবির কুমিল্লা ব্যাটালিয়নের (১০ বিজিবি) অধিনায়ক কর্নেল মীর আলী এজাজ বলেন, সীমান্তে যেকোনো ধরনের অবৈধ প্রবেশ, অবৈধ অস্ত্র ও চোরাচালান বন্ধে বিজিবি সতর্ক রয়েছে। এখন পর্যন্ত এ ধরনের কাউকে পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, নিয়মিত ভারতীয় অবৈধ মালামাল জব্দ করা হচ্ছে এবং সীমান্তে তীক্ষ্ণ নজরদারি রাখা হয়েছে, যাতে কেউ অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করতে না পারে।