হিন্দি সিনেমায় ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ নায়ক নতুন কিছু নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাগ, কম সংলাপ আর বেশি অ্যাকশন—এই ছকে বহু নায়ক দর্শকদের মন জয় করেছেন। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক সুরেশ ত্রিবেণী (Suresh Triveni) তাঁর নতুন সিনেমা ‘সুবেদার’–এ সেই পরিচিত গল্পেই ফিরে গেছেন, তবে নতুন আবহে। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন ৬৯ বছর বয়সী অনিল কাপুর (Anil Kapoor)। বয়সের হিসাবে তিনি আর ‘ইয়ং ম্যান’ নন, কিন্তু পর্দায় তাঁর উপস্থিতি এতটাই প্রাণবন্ত যে দর্শক অনায়াসেই তাঁকে আবারও সেই পুরোনো অ্যাংরি নায়কের জায়গায় দেখতে পারেন।
‘সুবেদার’-এর প্রেক্ষাপট উত্তর ভারতের একটি ক্ষয়িষ্ণু ছোট শহর। স্থানীয় ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর আধিপত্যে সেখানে সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে। এই অস্থির পরিবেশেই এক সেনা কর্মকর্তা—পদমর্যাদায় খুব বড় নন—নিজেকে খুঁজে পান ক্ষমতার নির্মম এক চক্রের মুখোমুখি। সাধারণ অথচ শক্তিশালী এই প্রেক্ষাপটই ছবির গল্পকে এগিয়ে নেয়।
অর্জুন চরিত্রে অনিল কাপুর শহরে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় লাল জিপসি গাড়ি নিয়ে। গাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত স্মৃতি—প্রয়াত স্ত্রী আচার বিক্রি ও দরজির কাজ করে টাকা জমিয়ে গাড়িটি কিনেছিলেন। তাই লাল জিপসি অর্জুনের কাছে কেবল একটি যানবাহন নয়, আবেগের প্রতীকও। কিন্তু এই গাড়িকেই কেন্দ্র করে স্থানীয় এক অপরাধীর সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। ছোট সেই দ্বন্দ্বই ধীরে ধীরে বড় সংঘাতে রূপ নেয়।
শহরে অর্জুনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রভাকর, যার ভূমিকায় আছেন সৌরভ শুক্লা (Saurabh Shukla)। দুই বন্ধু মিলে কি পারবেন ভয়ংকর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে? এই প্রশ্নের মধ্য দিয়েই গল্প এগোয়।
ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে অনিল কাপুরের অভিনয়। পুরো সিনেমায় তাঁর চরিত্রটির সংলাপ খুব বেশি নয়। কিন্তু তাঁর অ্যাংরি লুক অনেক সময় সংলাপের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতেও তিনি বিস্ময়করভাবে প্রাণবন্ত। এই বয়সে যেভাবে পর্দায় লড়াইয়ের দৃশ্য সামলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি অর্জুন চরিত্রে এমন এক দৃঢ়তা এনেছেন, যা পুরো সিনেমাটিকে টেনে নিয়ে যায়।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে তিনি সংযমী, কিন্তু প্রভাবশালী। চরিত্রটির ভেতরের দ্বন্দ্ব—একদিকে কর্তব্যবোধ, অন্যদিকে জমে থাকা ক্ষোভ—এই দুইয়ের সংঘর্ষ ছবিকে আরও গভীরতা দেয়। ফলে অর্জুন কেবল একজন যোদ্ধা নন; তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি শেষ পর্যন্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
অর্জুনের মেয়ে শ্যামা চরিত্রে রাধিকা মদন (Radhika Madan) ভালো অভিনয় করেছেন। পরিচালক তাঁর চরিত্রটিকে যথেষ্ট স্বতন্ত্রতা দিয়েছেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তার মেয়ে হয়েও সে বাবার ওপর নির্ভর করে না; নিজের লড়াই নিজেই চালিয়ে যায়। অ্যাসিড হামলার হুমকি, ধর্ষণের চেষ্টা—সবকিছুর মুখোমুখি হয় নিজের শক্তিতেই।
পার্শ্ব চরিত্রগুলোর মধ্যে আদিত্য রাওয়াল (Aditya Rawal), সৌরভ শুক্লা, মোনা সিং (Mona Singh) এবং ফয়সাল মালিকও উল্লেখযোগ্য অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে মোনা সিং, যিনি ‘কোহরা ২’-এর পর আবারও একেবারে ভিন্নধর্মী চরিত্রে দর্শকদের চমকে দিয়েছেন।
গল্পের কাঠামো মূলত নায়কের পেশাগত ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে ঘিরে। পরিচালক সুরেশ ত্রিবেণী তাঁর আগের সিরিজ ‘দলদল’-এও প্রধান চরিত্রের ক্ষোভ ও ট্রমাকে গল্পের কেন্দ্রে রেখেছিলেন। তবে ‘সুবেদার’-এ সেই মানসিক দ্বন্দ্ব আরও পরিণতভাবে ফুটে উঠেছে। সাউন্ড ডিজাইন ও অধ্যায়ভিত্তিক ন্যারেশন ছবির নান্দনিকতা বাড়িয়েছে।
ক্লাইম্যাক্স অবশ্য কিছুটা চেনা ছকের। তবু অর্জুনের মানসিক লড়াই তুলে ধরার ক্ষেত্রে নির্মাতা সফল। তিনি দেখিয়েছেন, নায়ক শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে লড়ছেন না; সামাজিক অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধেও তাঁর অবস্থান।
ছবির পরিবেশ নির্মাণেও দক্ষতার পরিচয় মিলেছে। ছোট শহরের ভাঙাচোরা অবকাঠামো, ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর ভয়ংকর প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের অসহায়তা—সবকিছু এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে দর্শক সহজেই সেই বাস্তবতায় ঢুকে পড়েন। বহুদিন ধরেই হিন্দি সিনেমায় এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন ছোট শহরের বাস্তব চিত্র খুব কমই দেখা গেছে।
একটি ছোট শহরে ক্ষমতাশালী মাফিয়াদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়া এক মাঝারি পদমর্যাদার সেনাসদস্য—এই এক লাইনের গল্পকেই প্রায় দুই ঘণ্টার দ্রুতগতির ছবিতে বিস্তার করা হয়েছে। পুরোনো দিনের বলিউড অ্যাকশন-থ্রিলারের আবহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা, যেখানে নায়ক শুধু ব্যক্তিগত শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, দুর্নীতিগ্রস্ত পুরো ব্যবস্থার সঙ্গেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
তবে সবকিছু নিখুঁতভাবে এগোয় না। কিছু জায়গায় ছবির গতি একটু হোঁচট খায়। কয়েকটি দৃশ্যে মনে হয় গল্পটি আরও সংযতভাবে বলা যেত, আর চাইলে দৈর্ঘ্যও কিছুটা কমানো সম্ভব ছিল। তবু সুরেশ ত্রিবেণীর নির্মাণশৈলী এবং অনিল কাপুরের শক্তিশালী উপস্থিতি সেই দুর্বলতাগুলো অনেকটাই ঢেকে দেয়।


