বাংলাদেশের উৎপাদন ও শ্রমনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত—নতুন চাপের মুখে বাণিজ্য সম্পর্ক

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশের উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা বা অতিরিক্ত উৎপাদন হচ্ছে কি-না এবং পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর (USTR)) গত বুধবার জানায়, অতিরিক্ত উৎপাদন বা সক্ষমতা বিষয়ে বাংলাদেশসহ মোট ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। এরপর বৃহস্পতিবার তারা আরেকটি ঘোষণা দিয়ে জানায়, বাংলাদেশসহ প্রায় ৬০টি দেশ পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে কি-না সেটিও আলাদা করে খতিয়ে দেখা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জ্যামিয়েসন গ্রির বলেন, এই তদন্তের মাধ্যমে যদি কোনো দেশের বিরুদ্ধে ‘অন্যায্য’ বাণিজ্য কার্যক্রমে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সেই দেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আমদানি কর বা শুল্ক আরোপ করতে পারবে।

জোরপূর্বক শ্রমের বিষয়ে তদন্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে দেখবেন—এ ধরনের শ্রম ব্যবহার করে তৈরি পণ্য বিক্রি বন্ধে ব্যর্থ হয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো মার্কিন ব্যবসার ক্ষতি করছে কি-না।

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ফেব্রুয়ারিতে যে অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তার মেয়াদ জুলাইয়ে শেষ হওয়ার আগেই এই তদন্ত শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

এই তদন্তের আওতায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যেমন চীন, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতি বাতিল করে দেওয়ার পরপরই এই তদন্ত শুরু করার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

ইউএসটিআর জানিয়েছে, তদন্ত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরামর্শের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তালিকাভুক্ত দেশগুলোর সরকারকে আলোচনার জন্য অনুরোধপত্রও পাঠানো হয়েছে।

প্রতিটি দেশকে ১৭ মার্চের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে হবে। এরপর মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

তদন্তে কী দেখবে যুক্তরাষ্ট্র

পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা দিয়ে ইউএসটিআর জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ কেমন—সেটি খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে তৈরি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাদের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর, সেটি মূল্যায়ন করা হবে।

এছাড়া এসব দেশের নীতি বা চর্চা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর কোনো ধরনের বোঝা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে কি-না, তাও পরীক্ষা করা হবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো বিদেশি সরকারের নীতি বা কর্মকাণ্ড যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়ামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

এ বিষয়ে এখনো বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

তবে সরকারের বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান শুক্রবার ঢাকার দৈনিক সমকাল পত্রিকাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তদন্ত শুরু করলেও এতে বাংলাদেশের জন্য বড় কোনো ঝুঁকি দেখছেন না তারা। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রশ্ন বা তথ্য চাইলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশ কেন এই তালিকায়

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট (U.S. Supreme Court) বাতিল করে দেওয়ার পর বিকল্পভাবে শুল্ক আরোপের পথ খুঁজতেই এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে।

২০২৫ সালের ২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়। তখন বাংলাদেশের ওপর শুল্ক হার নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫ শতাংশ।

পরবর্তীতে আলোচনার পর সেই হার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

এরপর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করায় সেই নীতি বাতিল হয়ে যায় এবং এআরটি চুক্তিও এখনো কার্যকর হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে বিকল্পভাবে শুল্ক আরোপের পথ তৈরি করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তদন্তে এসব অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর কর বা শুল্ক আরোপ করা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka)-এর ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবুল খায়ের বলেন, যেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেশি হয়, মূলত সেসব দেশকেই তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতের বড় রপ্তানিকারক দেশ হওয়ায় এই তালিকায় এসেছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত দেখতে চাইবে—ভর্তুকি, বিশেষ সুবিধা বা সস্তা শ্রমের অপব্যবহার করে কোনো দেশ উৎপাদন খরচ কমিয়ে রাখছে কি-না, যার ফলে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

তদন্তে এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপ করতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ড. আবুল খায়েরের মতে, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কিছু ছাড় পেতে পারে। পাশাপাশি আলোচনার সুযোগও রয়েছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি চীন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে যেভাবে ব্যবস্থা নেয়, একইভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কঠোর পদক্ষেপ নেয়—তাহলে সেটি বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে বলেই তারা এসব পদক্ষেপ নিতে পারছে এবং কেন করছে সেটিও অনেকটা স্পষ্ট।

তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার সংজ্ঞা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে।

তার ভাষায়, বাজার অর্থনীতিতে অসংখ্য উৎপাদক চাহিদা বিশ্লেষণ করে উৎপাদন ঠিক করেন। স্থানীয় ও বৈশ্বিক চাহিদা বাড়লে সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে রাখাও স্বাভাবিক বিষয়।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পে অনেক বিনিয়োগ হয়েছে। আবার চিনি শিল্পেও সহায়তা দিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। একইভাবে তৈরি পোশাক খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলেও সেটি কেবল মার্কিন বাজারের জন্য নয়; বিশ্বের বিভিন্ন বাজারকে লক্ষ্য করেই উদ্যোক্তারা পরিকল্পনা করেন।

মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নির্ধারণ করবে যে এই সক্ষমতা তাদের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে—সেটিই বড় প্রশ্ন।

তিনি বলেন, শুল্ক আরোপ কিংবা এই ধরনের তদন্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত তাদের নিজস্ব বাণিজ্য নীতি প্রয়োগ করছে, যার বিরুদ্ধে অনেক যুক্তিও রয়েছে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র তদন্তে নামার আগেই বাংলাদেশের উচিত এ বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া, যাতে আলোচনার টেবিলে নিজেদের উদ্বেগ ও অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা যায়।

এদিকে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগের তদন্তে বাংলাদেশের নাম থাকাও অনেকের কাছে বিস্ময়ের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কারণ নব্বইয়ের দশকেই বাংলাদেশে আইন করে শিশু শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং দেশের তৈরি পোশাক খাতের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তেমনভাবে কখনো ওঠেনি।

তবে রেস্তোরাঁ ও নির্মাণ খাতে অতীতে কিছু অভিযোগ উঠলেও সরকার ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এসব নিয়ে কাজ করায় শিশু শ্রমের হার কমে এসেছে বলে মনে করা হয়।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি ডলার।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, বিপরীতে আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাণিজ্যে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত থাকে বাংলাদেশের পক্ষে।

বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছিল। তবে সেই নীতি সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র অনেক দেশের সঙ্গে নতুনভাবে চুক্তি বা আলোচনায় গেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যে চুক্তি হয়েছে তা নিয়ে দেশে বিতর্ক রয়েছে। গবেষকদের মতে, ওই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ অনেকটাই নিশ্চিত করতে পেরেছে, কিন্তু বাংলাদেশ সে তুলনায় কম সুবিধা পেয়েছে।

তাদের ধারণা, তৈরি পোশাক খাতকে বড় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানোর চিন্তা থেকেই বাংলাদেশকে ওই চুক্তিতে রাজি হতে হয়েছে। যদিও সেই চুক্তি এখনো কার্যকর হয়নি।