দীর্ঘ সময়ের টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের বরফ ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছে বলে কূটনৈতিক মহলে আভাস মিলছে। গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক ছিল বেশ বৈরী। তবে তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশই সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান জানাতে শুরু করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন জটিল ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে খুব শিগগিরই ভারত সফরে যেতে পারেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান (Khalilur Rahman)। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য এই সফরের নানা দিক নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী এক মাসের মধ্যেই সফরটি হতে পারে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে খলিলুর রহমানের প্রথম ভারত সফর। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এই সফরের পর ধাপে ধাপে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা প্রক্রিয়াও আবার স্বাভাবিক হতে পারে।
ইতিবাচক কিছু ইঙ্গিত
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে কয়েকটি ইতিবাচক ঘটনা সামনে এসেছে। প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর দিল্লি ও আগরতলায় বাংলাদেশের মিশন থেকে আবার ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা দেওয়া শুরু হয়েছে।
এর মধ্যেই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী নয়াদিল্লি সফর করেছেন। সেখানে তিনি ভারতের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এসব বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে।
একই সময়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কলকাতা–ত্রিপুরা পরিবহণও সীমিত পরিসরে আবার চালু হয়েছে। এছাড়া ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হ’\ত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীরকে গ্রে’\প্তার করেছে ভারতের পুলিশ। তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি সংকটে ভারতের সহযোগিতা চায় ঢাকা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারতের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (Iqbal Hasan Mahmud Tuku) জানিয়েছেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে নয়াদিল্লিকে চিঠি পাঠিয়েছে ঢাকা।
গত বুধবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা (Pranay Verma)-র সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেন, বাংলাদেশে ডিজেল ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহের বিষয়টি ভারত বিবেচনা করছে।
সম্পর্কের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির (Humayun Kabir) বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটাই পারস্পরিক চাহিদা ও স্বার্থের ওপর নির্ভর করে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার স্পষ্ট আগ্রহ রয়েছে এবং ভারতের দিক থেকেও একই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত আত্মমর্যাদা ও সমতার ওপর। গণ–অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষও এমন সম্পর্কই প্রত্যাশা করছে।
হুমায়ুন কবিরের মতে, দুই দেশের সামনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্তে বর্ডার কি’\লিং, পুশইন, গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন এবং বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করার মতো বিষয়গুলো। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে যে বিশ্বাসের সংকট তৈরি হয়েছে, সেটি কাটিয়ে উঠতে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ জরুরি।
কূটনৈতিক যোগাযোগের নতুন অধ্যায়
সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই ভারত জানিয়েছিল, তারা নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া (Khaleda Zia)-র মৃ’\ত্যুর পর গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় এসে শেষ শ্রদ্ধা জানান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
সে সময় তিনি নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)-র পাঠানো শোকবার্তা তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। পরে চেন্নাইয়ে এক অনুষ্ঠানে জয়শঙ্কর বলেন, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এই অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে তারা আশা করছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে তিনি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা, আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং যোগাযোগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে যৌথ অগ্রগতির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ড. খলিলুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক নতুন করে আলোচনায় আসে। এর আগে তিনি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের সপ্তম অধিবেশনেও অংশ নিয়েছিলেন এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল (Ajit Doval)-কে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যেই নমনীয় মনোভাব স্পষ্ট হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ (Shama Obaed) বলেছেন, জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না সরকার। তাঁর মতে, ভারতকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; তবে পারস্পরিক আস্থা ও স্বার্থ নিশ্চিত করেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হবে।


