দেশের উচ্চশিক্ষা প্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য (ভিসি) পদে রদবদল আনা হয়েছে, পাশাপাশি পরিবর্তন এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান পদেও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম (ABM Obaidul Islam)। তিনি এতদিন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (Bangladesh Open University)-এর উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদ (Mamun Ahmed) নতুন ইউজিসি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উপাচার্য নিয়োগে ছয়টি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—সাইটেশন, কোটেশন, গুগল সার্চ, পিএইচডি, পোস্টডক এবং এমফিল। যাদের পারফরম্যান্স ভালো, তাদেরই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
ঈদুল ফিতরের আগে শেষ কর্মদিবস সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন (A N M Ehsanul Haque Milan) নতুন নিয়োগগুলোর ঘোষণা দেন।
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন মুখ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হচ্ছেন অধ্যাপক মো. আল ফোরকান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য হয়েছেন অধ্যাপক রইসউদ্দিন।
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নুরুল ইসলাম খানকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য করা হয়েছে। এছাড়া খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অধ্যাপক মো. মাসুদ।
শিগগিরই এসব নিয়োগে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানা গেছে।
ভর্তিতে লটারি থাকবে না
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আরও জানান, আগামী বছর থেকে স্কুলে ভর্তির বিদ্যমান লটারি পদ্ধতি বাতিল করা হবে। তিনি বলেন, ‘লটারি কোনো শিক্ষাব্যবস্থায় থাকতে পারে না।’ এর পরিবর্তে সহজ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে, তবে এতে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা তৈরি করা হবে না।
তিনি আরও বলেন, ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কেউ কোচিং বাণিজ্য করার চেষ্টা করলে সরকার তা বরদাশত করবে না। প্রয়োজনে সরকার নিজস্ব ব্যবস্থায় ‘ইনহাউজ কোচিং’-এর ব্যবস্থা করবে।
ম্যানেজিং কমিটিতে নতুন শর্ত
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডিতে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নতুন শর্তও জানিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব পদে থাকতে হলে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হবে স্নাতক ডিগ্রি। এই নিয়ম স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হবে।
রাজনৈতিক বিবেচনা নিয়ে প্রশ্ন
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘রাজনীতি করা কোনো অপরাধ নয়, এটি ডিসকোয়ালিফিকেশনও নয়।’
তিনি দাবি করেন, প্রতিটি নিয়োগই যাচাই–বাছাই করে করা হয়েছে এবং যাদের পারফরম্যান্স ভালো, তারাই দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘শিক্ষাগত যোগ্যতাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’
বৃত্তি পরীক্ষা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক থাকছে না বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, যারা ইচ্ছুক নয় তারা এই পরীক্ষায় অংশ না নিলেও চলবে।
এ বছর শিক্ষার্থীরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার চার মাস পর এই পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নেতৃত্ব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বর্তমানে ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব)-এর সভাপতি এবং বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন, যিনি গত ২২ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন।
অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং ১৯৯৯ সালে জাপানের তোয়ামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সাদা দলের আহ্বায়ক ছিলেন।
ইউজিসিতে নতুন চেয়ারম্যান
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজকে ইউজিসি চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছিল। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি সোমবার পদত্যাগ করেন।
এরপর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ১৯৯৬ সালে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন এবং একই বছর জাপানের নিহন ইউনিভার্সিটি থেকে মলিকুলার ভাইরোলজিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
