তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রথম এক মাস—সময়ের হিসেবে সংক্ষিপ্ত হলেও ঘটনাপ্রবাহে ছিল ঘনঘটা, উদ্যোগ আর বিতর্কের মিশেল। শুরুতেই জনতুষ্টিমূলক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় আসে সরকার। তবে একই সঙ্গে কিছু সিদ্ধান্ত ও আচরণ জনমনে প্রশ্নও তুলেছে।
ক্ষমতায় এসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman) তার দায়িত্ব পালনে অনাড়ম্বরতার ছাপ রেখেছেন। যাতায়াতে প্রটোকল কমানো, জনভোগান্তি হ্রাস—এসব পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। অনেকে এটিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের বিপরীতধর্মী এক বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন।
অর্থনীতির দিক থেকেও কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার মধ্যেও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা—এসব সিদ্ধান্ত জনগণের প্রশংসা কুড়িয়েছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বহু দেশে জ্বালানির দাম বাড়লেও বাংলাদেশে তা স্থির রাখা সরকারের একটি বড় সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই রাজনৈতিক সৌজন্যের নজিরও দেখা যায়। সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)-এর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করেন তারেক রহমান। এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
তবে এই ইতিবাচকতার মাঝেই কিছু বিতর্ক সামনে এসেছে। গণভোটে পাস হওয়া সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং সংস্কার পরিষদ গঠন না করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারদলীয় এমপিদের শপথ গ্রহণ না করাও বিতর্ক বাড়িয়েছে। বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে এ নিয়ে দূরত্বও তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচন না দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্তও সমালোচিত হয়েছে। সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় লোক বসানোকে অনেকেই গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী হিসেবে দেখছেন।
প্রশাসনিক পরিবর্তনেও এসেছে নানা আলোচনা। বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)-এর গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, দুদক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (University Grants Commission)-এর চেয়ারম্যানের বিদায় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও কোথাও প্রক্রিয়াটি ‘দৃষ্টিকটু’ বলেও অভিহিত হয়েছে।
একই সময়ে সরকার বেশ কিছু জনমুখী কর্মসূচি চালু করেছে। ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় হাজারো পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী, কৃষিঋণ মওকুফ, খাল খনন কর্মসূচি, মেট্রো ও রেলে ভাড়া ছাড়—এসব উদ্যোগ সরকারের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশাল রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে এসব কর্মসূচি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাত, এমনকি খু’\নো’\খু’\নি ঘটনার খবরও এসেছে। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
শিক্ষা খাতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ যেমন পুনঃভর্তি ফি বাতিল, শিক্ষক সুবিধা বৃদ্ধি—এসব প্রশংসিত হলেও পরিচালনা কমিটির যোগ্যতা শিথিল করার সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। পরে সরকার জানায়, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
অন্যদিকে নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। হাইকোর্ট (High Court)-এ একের পর এক রিট আবেদনের মাধ্যমে ফলাফল চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ বেশ কয়েকজন প্রার্থীর আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে, প্রথম এক মাসে তারেক রহমান সরকারের পদক্ষেপগুলো যেমন আশার সঞ্চার করেছে, তেমনি কিছু সিদ্ধান্ত ও বাস্তবতা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ‘মধুচন্দ্রিমা’ সময়ের প্রশংসা ধীরে ধীরে বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ছে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
