আজ ২৫ মার্চ—ভয়াল কালরাত, জাতীয় গণহ’\ত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই রাতেই পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহ’\ত্যার সূচনা হয়েছিল এ ভূখণ্ডে। মধ্যরাতে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, শুরু হয় নির্মম হ’\ত্যাযজ্ঞ।
এই গণহ’\ত্যা শুধু এক রাতের ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার সুপরিকল্পিত অভিযানের সূচনা। পরবর্তী নয় মাস ধরে লাখ লাখ নিরপরাধ নারী, পুরুষ ও শিশুকে হ’\ত্যার মধ্য দিয়ে সেই বর্বরতা চূড়ান্ত রূপ পায়। বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে এটি এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
এদিকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আজ সারা দেশে গণহ’\ত্যা দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। দেশের সব স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণে ২৫ মার্চের গণহ’\ত্যা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
এছাড়া দুপুর ১২টা থেকে ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় মিনিপোলগুলোয় গণহ’\ত্যাবিষয়ক দুর্লভ আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দিনটি উপলক্ষে বাদ জোহর বা সুবিধাজনক সময়ে সারা দেশের মসজিদে বিশেষ মোনাজাত এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে ২৫ মার্চ রাতে নি’\হতদের স্মরণ করা হবে।
এই দিনটি স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka) নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। উপাচার্যের বাসভবনসংলগ্ন স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় মোমবাতি প্রজ্বালন, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন এবং আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম এতে সভাপতিত্ব করবেন।
বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে সেই বিভীষিকার চিত্র। অস্ট্রেলিয়ার ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’-এর ভাষ্যমতে, শুধু ২৫ মার্চ রাতেই প্রায় এক লাখ মানুষকে হ’\ত্যা করা হয়েছিল। অন্যদিকে মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন (Robert Payne) লিখেছেন, ওই রাতে সাত হাজার মানুষ নি’\হত হন এবং আরও তিন হাজারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সামরিক ভাষায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পরিচিত এই অভিযান ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর পরিকল্পিত গণহ’\ত্যার অংশ। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ এড়িয়ে এই নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়। ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে বিভীষিকা—রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে চলে অগ্নিসংযোগ ও হ’\ত্যাযজ্ঞ।
এই বর্বর হামলায় শহীদ হন প্রখ্যাত শিক্ষক ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ অনেকে। একই রাতে গ্রেপ্তার করা হয় জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান (Sheikh Mujibur Rahman)-কে।
ভয়াবহ সেই কালরাত বাঙালি জাতিকে স্তব্ধ করে দিলেও থামিয়ে রাখতে পারেনি তাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। বরং নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত সেই রাতই বাঙালিকে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে। পরদিন ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman) চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম শেষে লাখো শহীদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।
