শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman) ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম বন্দরনগরীতে তার অধীনস্থ বাঙালি সেনাদের সংগঠিত করে তিনি সশস্ত্র বিদ্রোহের সূচনা করেন, যা স্বাধীনতার লড়াইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ—বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস—পরবর্তীতে এক স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে জিয়াউর রহমান এই দিনটিকে ‘বাঙালির হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা দিন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। সে সময় তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর হিসেবে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদে কর্মরত ছিলেন।
স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীতে, ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বার্থ অব অ্যা নেশন’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। নিবন্ধটি প্রকাশের সময় তিনি সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং তার পদবি ছিল মেজর জেনারেল। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় নিবন্ধটি পুনর্মুদ্রিত হয়।
নিজের লেখায় জিয়া উল্লেখ করেন, ‘সময়টা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি বাঙালি অফিসার, জেসিও ও জওয়ানদের ডেকে সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দিই। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই নির্দেশ মেনে নেয়।’
এই নির্দেশের পর তিনি সেনাদের নিয়ে চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে কালুরঘাট এলাকায় যান, যেখানে বেতার কর্মীরা একটি অস্থায়ী ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ স্থাপন করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।
নিবন্ধে তিনি পাকিস্তান আমলে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিষয়টি তুলে ধরেন। বিশেষ করে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ (Muhammad Ali Jinnah)-এর ‘উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণাকে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনাবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করেন।
জিয়া লিখেছেন, পাকিস্তানি শাসকদের কর্মকাণ্ডই বাঙালিদের সশস্ত্র প্রতিরোধে বাধ্য করেছিল। তিনি তার স্মৃতিচারণে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ, ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনের কথা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ মুজিবুর রহমান (Sheikh Mujibur Rahman)-কে কেন্দ্র করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ঘটনাও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে তোলে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার ভাষায়, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ছিল ‘গ্রিন সিগন্যাল’, যার পরই মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়। এরপর নেমে আসে ২৫ ও ২৬ মার্চের ভয়াল রাত, যখন পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর নৃশংস হ’\ত্যাযজ্ঞ চালায়।
সেই রাতে তিনি চট্টগ্রাম বন্দরে যাওয়ার নির্দেশ পেলেও পথে বাঙালি কর্মকর্তা মেজর খালেকুজ্জামান চৌধুরীর কাছ থেকে হামলার খবর পেয়ে ফিরে আসেন। ব্যাটালিয়নে গিয়ে দেখেন, বাঙালি সৈন্যরা পাকিস্তানি অফিসারদের বন্দি করেছে।
তিনি বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে একটি টেলিফোন অপারেটরের মাধ্যমে ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্টদের জানান যে, ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করেছে এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াই করবে।
এরপর তিনি নিজ ইউনিটের সেনাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেই মুহূর্তের বর্ণনায় তিনি লিখেছেন, ‘তারা সব জানত, তবুও আমি সংক্ষেপে তাদের সবকিছু বললাম।’
প্রায় ৩ হাজার ৬৫০ শব্দের এই নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, একজন সাংবাদিকের অনুরোধে তিনি এটি লিখেছিলেন। নিজেকে একজন সৈনিক হিসেবে উল্লেখ করে জিয়া বলেন, লেখালেখি তার স্বাভাবিক কাজ নয়, তবুও ইতিহাসের সেই আবেগঘন মুহূর্ত তাকে কলম ধরতে বাধ্য করেছিল।
