আলোচনা-সমালোচনার নামে এমন কিছু বলা ঠিক হবে না, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খাটো করে—এই বার্তাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique Rahman)। তিনি বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরব নিয়ে আলোচনা, বিশ্লেষণ ও গবেষণা চলবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে সেই আলোচনা যেন কখনোই ইতিহাসকে বিকৃত বা খাটো করার দিকে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
শুক্রবার রাজধানীর রমনা (Ramna) এলাকায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান তার বক্তব্যের শুরুতেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman)সহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সকল জাতীয় নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একইসঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা, আহত ও পঙ্গু যোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সাধারণ মানুষের অবদানকে স্মরণ করেন, যাদের আত্মত্যাগেই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।
অতীত ও ভবিষ্যতের ভারসাম্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীত নিয়ে অতিরিক্ত পড়ে থাকলে যেমন দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত হয়ে যায়, তেমনি অতীতকে পুরোপুরি ভুলে গেলে জাতি পথ হারায়। তার ভাষায়, অতীত ভুলে যাওয়া যেমন অন্ধত্ব, তেমনি শুধু অতীতেই ডুবে থাকাও ভবিষ্যতের পথকে বাধাগ্রস্ত করে।
সভায় বক্তারা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায় হিসেবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে উল্লেখ করেন। অনেকেই ছিলেন যারা সরাসরি যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বহন করেন। তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী প্রজন্মের শেখা ইতিহাস—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এই জাতীয় চেতনা।
তরুণদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের এক অনিবার্য চরিত্র। অতীতে বিভিন্নভাবে তার অবদানকে খাটো করার চেষ্টা হয়েছে, যা উল্টো তার গুরুত্বই আরও স্পষ্ট করে। তিনি বলেন, জিয়া হঠাৎ করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি; বরং দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনি লালন করেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘একটি জাতির জন্ম’ প্রবন্ধের উল্লেখ করেন, যা ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেই লেখার একটি অংশ উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিট—এই সময়টিকে শহীদ জিয়া বাঙালির হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, যা জাতি কখনো ভুলবে না।
তারেক রহমান দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এই প্রবন্ধ প্রকাশিত হলেও তখন কোনো মহল থেকেই এর বিরোধিতা বা প্রশ্ন তোলা হয়নি। ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় পুনঃপ্রকাশের সময়ও কেউ এর বক্তব্য খণ্ডন করেনি। তার মতে, এটি প্রমাণ করে প্রবন্ধে উল্লেখিত বিষয়গুলো সত্য ও গ্রহণযোগ্য ছিল।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, স্বাধীনতার মূল্য কেবল তারাই বুঝতে পারে যারা এর জন্য সংগ্রাম করে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফিলিস্তিনের জনগণের কথা উল্লেখ করেন, যারা এখনও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলনের শহীদদের স্বপ্ন ছিল একটি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস প্রকাশ করেন।
বর্তমান সরকারকে জনগণের সরকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উন্নয়নে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
শেষে দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান—এই স্বাধীনতা দিবসে অঙ্গীকার হোক, সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সহাবস্থানের মাধ্যমে একটি ভালো সমাজ গড়ে তোলা। বিভাজন নয়, ঐক্যই হোক শক্তি—এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (Mirza Fakhrul Islam Alamgir)। সঞ্চালনায় ছিলেন প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু (Sultan Salahuddin Tuku)। এছাড়া বক্তব্য রাখেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমেদ।
