জাতীয় সংসদে গণভোট আর বিল আকারে উঠছে না—এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। তাদের মতে, গণভোটের কার্যকারিতা ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ায় এটিকে নতুন করে বিল হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়োজন নেই। তবে এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami)।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২ এপ্রিল সংসদে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশেষ কমিটি। এর মধ্যে মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন, গু’\ম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংশোধনী আকারে আনার প্রস্তাবে কমিটির ভেতরেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা এসব প্রস্তাবের বিরোধিতা করে ১৫টি অধ্যাদেশের বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন।
রোববার রাতে জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। রাত সাড়ে ৮টায় শুরু হয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে বৈঠকটি। টানা তৃতীয় দিনের আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সবগুলো অধ্যাদেশের ওপর প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষ করে কমিটি। আগামী ২ এপ্রিল সংসদে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গণভোট অধ্যাদেশ ইতোমধ্যেই তার উদ্দেশ্য পূরণ করেছে। এর আওতায় ভবিষ্যতে আর কোনো গণভোট অনুষ্ঠিত হবে না। ফলে এটিকে নতুন করে বিল আকারে এনে আইন করার কোনো প্রয়োজন নেই এবং এটি রেটিফিকেশনেরও দাবি রাখে না।
অন্যদিকে, কমিটির সদস্য ও বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান (Rafiqul Islam Khan) বলেন, বেশ কিছু মৌলিক বিষয়ে তারা শুরু থেকেই দ্বিমত পোষণ করে আসছেন এবং এখনো সেই অবস্থানে অনড় রয়েছেন। তার অভিযোগ, সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কিছু সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন এবং গু’\ম-খু’\ন প্রতিরোধ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার দলীয় প্রভাবের মধ্যে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিচারপতি নিয়োগের বাছাই কমিটির মতো সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলো বাতিল করে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীনতা খর্বের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল। তাদের মতে, এসব পরিবর্তন জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে।
সংবিধানে গণভোটের বিধান রাখা না রাখা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, গণভোটের সঙ্গে গোটা জাতি সম্পৃক্ত। এটিকে বাতিল করার প্রস্তাব তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন—যদি গণভোট সংবিধানবহির্ভূত হয়, তবে একই দিনে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন কীভাবে বৈধ হয়? জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে যে রায় দিয়েছে, তা কার্যকর করাই উচিত বলে মত দেন তিনি।
তিনি জানান, যেসব বিষয়ে কমিটির ভেতরে ঐকমত্য হয়নি, সেগুলো চূড়ান্ত আলোচনার জন্য সংসদ অধিবেশনে আবার তোলা হবে। ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১০ থেকে ১৫টি বিষয়ে আংশিক সংশোধনীসহ একমত হওয়া গেলেও বাকি বিষয়গুলোতে আপসের সুযোগ কম বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
এদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed) বলেন, প্রতিটি অধ্যাদেশ নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। অনেকগুলো বর্তমান অবস্থায় পাস করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, কিছু সংশোধন করে বিল আকারে আনা হবে, আর কিছু বিষয় পরবর্তী অধিবেশনে বিবেচনার জন্য রাখা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিরোধী ও সরকারি দলের সদস্যরা যেসব বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন, সেগুলো কমিটির প্রতিবেদনে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পরবর্তীতে বিল আকারে সংসদে উপস্থাপন হলে আইন প্রণয়নের সময় সবাই তাদের মতামত তুলে ধরতে পারবেন।
গণভোট অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি পুনরায় বলেন, এর ব্যবহার ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। তাই এটিকে নতুন করে আইনে রূপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন (Zainul Abedin)-এর সভাপতিত্বে বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম (Nurul Islam), আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান (Md. Asaduzzaman), ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ এম মাহবুব উদ্দিন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মো. মুজিবুর রহমান, জি এম নজরুল ইসলামসহ আরও অনেকে। বিশেষ কমিটির আমন্ত্রণে মোহাম্মদ নাজিবুর রহমানও বৈঠকে অংশ নেন।
