পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার—সংসদে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা

দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে সরকার—এমনটাই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)। বুধবার (১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ (Jatiya Sangsad)-এ পৃথক দুটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী জানান, আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের চিহ্নিত ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলায় পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina), সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তিনি বলেন, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, এইচ বি এম ইকবাল এবং সামিট গ্রুপসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য ও স্বার্থসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে।

সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিগত ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে’ সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির ঘটনা অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে চলে গেছে। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

তিনি বলেন, পাচার হওয়া অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ (এমএএলটি) সম্পাদনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

পাচার হওয়া অর্থের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশ চিহ্নিত করা হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তির বিষয়ে ইতোমধ্যে সম্মতি পাওয়া গেছে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে দুর্নীতি দমন কমিশন (Anti-Corruption Commission)-এর নেতৃত্বে সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশে (২৫ মার্চ ’২৬) দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আইন মেনে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আমরা চাই—কেউ যেন ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়। যারা দেশের অর্থ পাচার করেছে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাচার হওয়া অর্থ মূলত জনগণের অর্থ। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে সেই অর্থ ফিরিয়ে এনে দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে ব্যয় করাই সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে হলেও সরকার এই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।