আল্লাহতায়ালা ইবাদতের জন্য মসজিদকে নির্ধারণ করেছেন—এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং মুসলমানদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। মসজিদের প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত থাকে সেখানে উপস্থিত মুসল্লিদের কাতারবদ্ধ নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত এবং আল্লাহর জিকিরে। কিন্তু বর্তমান সময়ে সমাজে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—মসজিদকে জাঁকজমকপূর্ণ ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলার প্রতিযোগিতা।
বিশেষ করে, মসজিদের বাইরে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, মরিচবাতি কিংবা ঝাড়বাতির ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে আভিজাত্য প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অথচ ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা এই ধরনের বাহ্যিক প্রদর্শনকে উৎসাহিত করে না—বরং তা থেকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
প্রথমত, এ ধরনের প্রবণতা কিয়ামতের একটি আলামত হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মানুষ মসজিদ নিয়ে গর্ব ও অহংকার করতে শুরু না করা পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না।” আবার ইমাম বুখারি (র.) উল্লেখ করেন, মানুষ মসজিদ নিয়ে গর্ব করবে, কিন্তু ইবাদতের মাধ্যমে তা আবাদ করবে না। এটি স্পষ্ট করে দেয়—বাহ্যিক চাকচিক্য নয়, বরং ইবাদতই মসজিদের মূল উদ্দেশ্য।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা বা সাজসজ্জা ‘ইসরাফ’ বা অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” মসজিদের প্রয়োজনীয় আলোর বাইরে শুধু সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্য অর্থ ব্যয় করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। ফিকহের গ্রন্থগুলোতেও একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মসজিদে অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, অতিরিক্ত কারুকার্য বা আলোকসজ্জা মুসল্লিদের মনোযোগ বিচ্যুত করতে পারে, যা ইবাদতের জন্য ক্ষতিকর। ইসলামী ফিকহবিদদের মতে, এমন কিছু যা নামাজে মনোযোগে বিঘ্ন ঘটায়, তা মকরুহ। ইতিহাসে দেখা যায়, হজরত উমর (রা.) মসজিদে নববির পুনর্নির্মাণের সময় জাঁকজমকপূর্ণ সাজসজ্জা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে মুসল্লিরা একাগ্রচিত্তে ইবাদত করতে পারেন।
চতুর্থত, পূর্বসূরিদের সতর্কবাণীতেও এই বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। হজরত আলী (রা.) এমন এক সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন, যখন মানুষ বাহ্যিকভাবে মসজিদকে প্রাসাদের মতো সাজাবে, কিন্তু তা আল্লাহর স্মরণ থেকে শূন্য থাকবে। একইভাবে ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদকে জাঁকজমকপূর্ণ করার জন্য নির্দেশ দেননি। বরং তিনি সতর্ক করেছিলেন, যেন মুসলমানরা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মতো উপাসনালয়ের বাহ্যিক সাজসজ্জায় প্রতিযোগিতায় না জড়ায়।
সবশেষে, আমাদের করণীয় হলো—মসজিদকে বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতার জায়গা না বানিয়ে, ইবাদতের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরের মাধ্যমে মসজিদকে আবাদ করাই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য। বাহ্যিক চাকচিক্যের পরিবর্তে আধ্যাত্মিক উন্নয়নেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক উপলব্ধি দান করুন এবং মসজিদের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষার তৌফিক দিন।


