ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব এসে পড়েছে দেশের জ্বালানি বাজারে, আর তার ভার বহন করছে উৎপাদনমুখী প্রায় সব শিল্প খাত। পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে শিল্পকারখানাগুলো গভীর সংকটের মুখে পড়ছে—এমন আশঙ্কা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে।
বিশ্ববাজারে ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ সরবরাহের ঘাটতি এবং ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অবৈধ মজুত—সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। শিল্পমালিকদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালানোর মতো জ্বালানি না থাকায় অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গ্রীষ্মকালীন সেচ মৌসুমে কৃষিখাতেও একই চিত্র—ডিজেলের সংকটে সেচযন্ত্র চালানো যাচ্ছে না, ফলে ফসল উৎপাদনেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এই বহুমাত্রিক সংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং প্রবৃদ্ধি—সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মুখে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে মূল্যস্ফীতি নতুন করে বাড়তে পারে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ (Mahbub Ahmed) বলেন, সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ বা টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। তার মতে, পেট্রোল ও অকটেন যেহেতু আংশিকভাবে দেশীয় উৎস থেকেই আসে, তাই এ দুটি নিয়ে বড় সংকট হওয়ার কথা নয়। তবে ডিজেলের অবৈধ মজুত বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
অন্যদিকে সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতিতে দেশের সার কারখানাগুলোও নিয়মিত উৎপাদন ব্যাহত করছে। যদিও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে সার আমদানি করা হয়, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই সরবরাহেও ভাটা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর ফলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোর টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে পোশাক খাতে সংকট আরও প্রকট। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মো. হাতেম (Mohammad Hatem) বলেন, জ্বালানির অভাবে কারখানার নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে, জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। ফলে লোডশেডিংয়ের সময় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে কারখানার বয়লার ও ডাইং ইউনিটও স্বাভাবিক গতিতে চলছে না।
তিনি আরও জানান, জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়ারও তাগিদ দেন তিনি। অন্যথায় রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় পণ্যবাহী জাহাজগুলো এখন দীর্ঘ পথ ঘুরে ইউরোপে যাচ্ছে। এতে লিডটাইম বেড়েছে, বেড়েছে কনটেইনার ভাড়াও। সময়মতো পণ্য সরবরাহ না করতে পারলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
সরকারি তথ্যমতে, দেশের মোট গ্যাসের প্রায় ১৮-২৪ শতাংশ সরাসরি শিল্পে ব্যবহৃত হয় এবং আরও ১০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় শিল্পকারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বর্তমানে বিদ্যুতের প্রায় ৬৬ শতাংশই গ্যাসনির্ভর। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে কাতার ও সৌদি আরব থেকে এলএনজি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া, ওষুধ, প্লাস্টিক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, টাইলস, স্টিল ও সিমেন্ট—প্রায় সব খাতই এখন চরম সংকটে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান (Mahmud Hasan Khan) বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ে, তেমনি পশ্চিমা ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতাও কমে যায়, যা রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ওষুধ খাতেও সংকট কম নয়। ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির (Abdul Muktadir) জানান, জ্বালানি সংকটে ওষুধ সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে। দেশের ১৫ হাজার ডেলিভারি ভ্যানের অনেকগুলোই ডিজেলের অভাবে ঠিকমতো চলতে পারছে না।
এদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (Dhaka Chamber of Commerce and Industry) সতর্ক করে বলেছে, জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে মাত্র ১০ ডলার বাড়লেই দেশের মাসিক আমদানি ব্যয় ৭০-৮০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জে ১৯টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
ড. এম মাশরুর রিয়াজ (M Masrur Riaz), চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশ, বলেন—জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য শুধু জ্বালানির উৎস নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার। সেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহেও ধস নামতে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। কমিটি স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থায়নের আলোচনা এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানা গেছে।


