এরপরই বেলা তার লক্ষ্যচ্যুত হয়—এমনটাই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক আলোচনায়। পরিবেশ আইন নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতা তৈরির পথ থেকে সরে গিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান (Syeda Rizwana Hasan) বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে ব্ল্যাকমেলের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। উন্নয়নবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে সমালোচনার মুখেও পড়েন তিনি। এরপর বিভিন্ন সুশীলমুখী পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে প্রভাববলয়ে প্রবেশ করেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী (Abu Bakar Siddiqui), যিনি এবিসি নামেও পরিচিত, আগে নসরুল হামিদ বিপু (Nasrul Hamid Bipu)-র প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৪ সালে এবি সিদ্দিকীর রহস্যজনক অপহরণের ঘটনা সামনে আসে। পরে এটি একটি সাজানো ঘটনা বলে দাবি করা হয় প্রতিবেদনে। বলা হয়, আলোচনায় আসার উদ্দেশ্যেই এই নাটক সাজানো হয়েছিল। তখনই জানা যায়, তিনি নারায়ণগঞ্জে হামিদ ফ্যাশনের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন—যা নসরুল হামিদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে সরাসরি ভূমিকা না থাকলেও, আসিফ নজরুল (Asif Nazrul)-এর সঙ্গে পূর্বপরিচয় এবং প্রভাবশালী মহলের তদবিরে রিজওয়ানা উপদেষ্টা হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উপদেষ্টা হওয়ার পর থেকেই তার ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রিজওয়ানার পক্ষে তার স্বামী বিভিন্ন খাতে অর্থ সংগ্রহ করতেন। মাত্র ১৮ মাসে পরিবেশ খাতসহ নানা ক্ষেত্রে তদবির ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। যদিও উপদেষ্টা হওয়ার আগে তাদের কোনো সম্পদ ছিল না বলে দাবি করা হয়েছিল, বর্তমানে তাদের সম্পদের দ্রুত বৃদ্ধি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সম্পদ বাণিজ্য ও গুলশান প্লট বিতর্ক
রাজধানীর গুলশান এলাকায় নসরুল হামিদের নামে থাকা একটি মূল্যবান প্লট নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (Anti-Corruption Commission – ACC) ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তার সম্পদ ক্রোকের উদ্যোগ নিলেও, এই প্লটটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে অভিযোগ। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, রিজওয়ানার তদবিরেই এটি বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
পূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্লটটি বাতিল করে সরকারের অনুকূলে নেওয়ার উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন, এতে উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ ছিল।
রিয়েল এস্টেট ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রভাব
মাদানী এভিনিউতেও নসরুল হামিদের পাঁচ বিঘা জমি বিক্রির তৎপরতায় এবি সিদ্দিকীর সক্রিয় ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। হামিদ রিয়েল এস্টেটের কার্যক্রমেও তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি হামিদ সোয়েটার লিমিটেডের মালিকানায় কাগুজে পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
পলিথিন নীতি ও ‘সমঝোতা’ অভিযোগ
উপদেষ্টা হওয়ার পর পলিথিনবিরোধী অবস্থান নিলেও, কয়েক মাসের মধ্যে সেই অভিযান থেমে যায়। অভিযোগ রয়েছে, উৎপাদকদের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে এই নীতির পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তীতে বাজারে আবার পলিথিনের ব্যবহার বেড়ে যায় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান বন্ধ হয়ে যায়।
সাদা পাথর ও পরিবেশ লুণ্ঠনের অভিযোগ
সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর এলাকায় পাথর উত্তোলন নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও চার মাস ধরে পাথর লুট চলতে থাকে। পরে দায় অন্যদের ওপর চাপিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
পরিবেশ ছাড়পত্র ও নিয়োগ বাণিজ্য
পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে ঘুষের অভিযোগ ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে। এমনকি উপদেষ্টার স্বামীর মাধ্যমে ছাড়পত্র পেতে হতো—এমন দাবিও রয়েছে। বন সংরক্ষক নিয়োগেও বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
টেন্ডারবিহীন কাজ ও গবেষণার নামে অর্থ আত্মসাৎ
সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে ঘনিষ্ঠদের কাজ দেওয়া, প্রচারণা না করেই অর্থ উত্তোলন, গবেষণার নামে অর্থ লোপাট—এসব অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি পুরোনো গবেষণা নতুন হিসেবে দেখানোর ঘটনাও রয়েছে।
ইটভাটা ও সেন্টমার্টিন ইস্যু
ইটভাটার লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ বাণিজ্য এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের অভিযোগও রয়েছে। পর্যটন নিষেধাজ্ঞার পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, এসব অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
