৬০ দিনের আল্টিমেটাম নয়, জাতিসংঘের চিঠি ঘিরে আওয়ামী লীগ নিয়ে ভাইরাল দাবিটি মিথ্যা

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ (Awami League)-এর ওপর থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে জাতিসংঘ (United Nations) বাংলাদেশ সরকার (Bangladesh Government)-কে চিঠি পাঠিয়েছে। তবে রিউমার স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দাবিটি সত্য নয়। মূল চিঠির বক্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে অনলাইনে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার করা হয়েছে।

ফ্যাক্টচেক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গণমাধ্যম কিংবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই, যেখানে বলা হয়েছে যে জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকার বা তারেক রহমানকে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নির্দেশনা বা অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। দাবিতে ব্যবহৃত প্রথম ভিডিওটিও এই বক্তব্যকে সমর্থন করে না। সেখানে সাংবাদিক কাজী রুনাকে ৬০ দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি করতে দেখা বা শোনা যায়নি। বরং তিনি বলেছেন, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় জাতিসংঘ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। সেই চিঠিতে বলা হয়েছিল, দলটির নিষিদ্ধ কার্যক্রমের কারণে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে, এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘ ১০টি প্রশ্ন তোলে।

অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন (OHCHR)-এর ওয়েবসাইটে চিঠিটির মূল কপিও পাওয়া যায়। সেখান থেকে জানা যায়, চিঠিটি ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। চিঠির মূল বিষয় ছিল ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকারের নেওয়া কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়ে তথ্য ও ব্যাখ্যা চাওয়া। এর মধ্যে বিশেষভাবে ছিল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, গণগ্রেফতার, এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal)-এ বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করার মতো বিষয়।

চিঠিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, দলটির রাজনৈতিক ও প্রচার কার্যক্রম বন্ধ করা, ব্যাপক গ্রেফতার অভিযান—যার মধ্যে “অপারেশন ডেভিল হান্ট”-এর কথাও উল্লেখ আছে—এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরুর মতো পদক্ষেপ মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকারকে সীমিত করতে পারে। ফলে এগুলো আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)-এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।

চিঠিতে আরও উদ্বেগ জানানো হয় যে, শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)সহ আওয়ামী লীগের নেতাদের বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায্য বিচারের নিশ্চয়তা, আইনজীবীদের নিরাপত্তা, আটক ব্যক্তিদের প্রতি আচরণ এবং হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। এসব প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে জোর দিয়ে বলেছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন বা অন্য কোনো আইনি কাঠামো যেন রাজনৈতিক দল দমন বা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ সীমিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না হয়। একই সঙ্গে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিঠিটির কোথাও ৬০ দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বলা হয়নি। বরং সেখানে বলা হয়েছে, চিঠির বক্তব্য এবং তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে যেকোনো জবাব ৬০ দিনের মধ্যে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। অর্থাৎ, ভাইরাল দাবিতে যে “৬০ দিন” বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে, সেটি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সীমা নয়; বরং চিঠি ও সম্ভাব্য জবাব প্রকাশের সময়সীমা।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, জাতিসংঘের চিঠির একটি অংশকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে এই দাবি ছড়ানো হয়েছে। তাই, আওয়ামী লীগের ওপর থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি পাঠিয়েছে—এমন প্রচারিত তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।